নবীগঞ্জ প্রতিনিধি ॥ নবীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী শতক গ্রামের শ্রী শ্রী ঠাকুর বাণী আশ্রমে সাড়ে ৫শ বছররে পুরনো একটি রহস্যময় তেতুঁলগাছ নিয়ে সর্বত্র আলোচনা চলছে। উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরনো এ তেতুঁল গাছরে কাহিনী যেন রুপকথার গল্পের মতো। লোকমুখে জানা গেছে, শ্রী শ্রী ঠাকুরবাণী নাথের হাতে রোপন করা গাছের তেতুঁল খেলে জটিল রোগের মুক্তি মিলে আর নি:স্তান দম্পতি সস্তান লাভ করেন। যে কারণে প্রতিদিনই ঐ গাছের নিচে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের শত শত দর্শনার্থীর আসেন তাদের মানত ও পূজা দিতে এবং মুসলমান নর-নারী আসেন নিজের মনোবাসনা পূরণের জন্য নিয়াজ অথবা শিরনী নিয়ে। বিশাল এ গাছের নীচে শ্রী শ্রী ঠাকুরবানী নাথ ঠাকুরের ১টি মন্দরি ১টি নাট মন্দির ও যাত্রী নিবাস বসতঘর রয়েছে ।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, নবীগঞ্জ উপজলো সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার অদূরে ১১নং গজনাইপুর ইউনিয়নের নবীগঞ্জের সীমান্ত ঘেষা শতক গ্রামের শ্রী শ্রী ঠাকুরবানী নাথ ঠাকুরের বাড়ীতে প্রায় সাড়ে ৫শত বছররে পুরনো একটি তেতুঁল গাছ রয়েছে। এই পুরনো কালের স্বাক্ষী তেতুঁল গাছটি দেখতে অনেকে যান ঠাকুর বানীর বাড়ীতে আবার কেউ কেউ কোন কিছু লাভের আশায় মানতও করে থাকেন সেখানে গিয়ে ।
এই গাছটি নিয়ে এলাকা নানা প্রবাদ রয়েছে। প্রায় ১০ কাঠা জমির ওপর ছড়িয়ে আছে এ বিশাল পুরনো তেঁতুল গাছটি। গাছের এক একটি শিকড় প্রায় ৩০-৪০ ফুট র্দীর্ঘ হয়ে চর্তুদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। যার প্রশস্থতা প্রায় ১৫ফুট উচ্চতা ৪০/৫০ ফুট উচু ডাল পালা নিয়ে ৬০/৭০ ফুট জায়গা নিয়ে ছড়িয়ে চিটিয়ে আছে। প্রায় ৫ বছর আগে এই গাছের শিকড় ২ কিলোমিটার দূরে দেখতে পাওয়া গেছে।
ঠাকুরবানী ঠাকুরের উত্তরসূরী দিনারপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রয়াত গৌরাপদ গোস্বামীর মৃত্যুর পর তার সহধর্মিণী ফালগুনী গোস্বামী মন্দিরের সেবায়েত হিসাবে তা পরিচালনা করে আসছেন। তিনি তেতুল গাছ সর্ম্পকে বলনে, শুনেছি অন্তত সাড়ে ৫শ বছর আগে ঠাকুর বানী নাথ (শিব বানী ঠাকুর) নামে এক ঠাকুর তার মা’র জন্য বাজার থেকে টক তেতুঁল নিয়ে আসেন। ওই তেঁতল খেয়ে শেষ হয়ে গেলে সকালে মা আবারো তেতুঁল খেতে চাইলে ঠাকুর বানীকে বলনে তখন ঠাকুর বানী মাকে জিজ্ঞাসা করেন আপনি তেতুল খেয়ে এর বীজ কোথায় রেখেছেন। মা তাকে বলেন, ঘরের শাশে রেখেছি। এ কথা শুনে ঠাকুর বাণী তেতুঁল বীজের কাছে গিয়ে হাতের লোটা থেকে একটু পানি ছিটিয়ে দিলে সাথে সাথে বীজ থেকে গাছ জন্ম নেয়।
এরপর গাছে ফুল ফুট ও তাতে তেতুঁল ধরে। তারপর ঐ গাছ থেকে ঠাকুর বাণী নিজ হাতে তেতুঁল পেড়ে হাতে নিয়ে মার কাছে দেন। মা তেতুঁল খাবার পর ঠাকুর বানী আবার চলে গিয়ে তেতুঁল গাছে উঠে অদৃশ্য হয়ে অন্তধ্যান হয়ে যান। অনেক খোঁজাখুঁজি করে ঠাকুর বানীকে আর পাওয়া যায়নি। এরপর থেকে ঠাকুর বানীর এ তেতুঁল গাছটিকে ঘিরে রহস্য বিরাজ করছে। হিন্দু মুসলিম সবাই বিস্বাস করেন ঠাকুর বানী জীবিত আছেন আর সেখানে বিরাজ করছেন। বিভিন্নি পূজার তিথিতে তিনি ঐগাছে আসেন তাই এ সময় দর্শনার্থীদের ভীড় জমে প্রতিটি পূজায়।
এলাকাবাসী জানান, সাধারনত তেতুঁল গাছের তেতুঁল টক হবার কথা থাকলওে তা টক নয়, অত্যান্ত সুস্বাদু ও মজাদার। যা একবার খেলে যে কারোরই বার বার খেতে ইচ্ছা হয়। অনেকে এ গাছের তেতুঁল খেয়ে মনোবাসনা পূরন হয়েছে বলেও লোকমুখে জানা যায়। প্রতি বছর ঐ গাছে ১৫/২০ মন তেতুঁল ধরে যা ভক্তবৃন্দের মাঝে বিতরণ করা হয়। তেতুঁল গাছের আকার বৃদ্ধি পেতে পেতে এখন বিশাল আকার ধারণ করছে। হিন্দু র্ধমাবলম্বীদের মতে প্রতি সরস্বতী ও দুর্গা পূজায় শিব ঠাকুর বানী তেতুঁল গাছে আসেন। ঐ দুটি পূজায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী লোকজন সারারাত জেগে র্কীতন করেন।
শতক বড়ইতলা গ্রামের সুবল দেব বলেন, আমাদের গ্রামের প্রায় সাড়ে ৫শ বছরের পুরোনো রহস্যময় তেতুঁল গাছটি সর্ম্পকে শুনেছি একদিনের মধ্যে গাছ রোপন করে ঠাকুবাণী উনার মাকে তেতুঁল খাওয়ার জন্য দিয়েছিলেন। এটা কোন রুপকথা নয় সর্ম্পূন সত্য ঘটনা । একই এলাকার নরপতি শীল বলেন, ঠাকুর বাবার হাতের লাগানো (ঠাকুর বানী) গাছের ফল তেতুঁল) খেলে যে কোন রোগ কমে যায়। ঠাকুর বানী মন্দিরের সেবায়েত প্রয়াত গৌরাপদ গোস্বামীর স্ত্রী বর্তমান সেবায়েত ফাল্গুনী গোস্বামী বলেন, ঠাকুর বানীর অলৌকিক এ তেতুঁল গাছ দেখার জন্য প্রতদিনই অনেক লোকজন মন্দিরে আসেন। ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী অনেকেই আসনে ঠাকুর বানী গাছের তেতুঁল খেতে। বাংলাদশের বিভিন্ন স্থান থেকেও অন্য ধর্মের লোকেরা ঠাকুর বানীর আশ্রমের তথ্য বিস্বাস করে গাছের তেতুঁল খেতে আসেন।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও নবীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি উত্তম কুমার পাল হিমেল জানান, আমরা ছোট বেলা থেকেই এই অলৌকিক গাছটি এমন দেখে আসছি। আমাদের দাদা ও মুরব্বীদের মুখে শুনেছি তাদের জন্মের অনেক আগেই গাছটির জন্ম। কথিত আছে এই গাছ কাটার নিয়ত করে কেউ গাছের কাছে গেলে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত এসে মারা যায়। বর্তমানে গাছটির গোড়ায় অনেকে মানত করে রান্না করা খাবার খেয়ে যায় এবং প্রতিদিন সন্ধ্যায় মোমবাতি আগরবাতি ও ধোপ জ্বালিয়ে নিবেদন করা হয়। তাই এ গাছটির রহস্য নিয়ে নবীগঞ্জ উপজেলার সাড়ে ৪ লক্ষ মানুষসহ আশপাশের উপজেলার মানুষের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।