স্টাফ রিপোর্টার ॥ হবিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় হামের প্রাদুর্ভাব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। গত দুই দিনে অর্ধশতাধিক শিশু হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলে জানা গেছে। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক রোগী আসায় হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র চাপ। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে। হাম আক্রান্ত শিশুদের অনেকের শরীরে জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া, শরীরে র্যাশসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। আক্রান্তদের মধ্যে বিভিন্ন বয়সী শিশু রয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের অভিভাবকরা তাদের নিয়ে জেলা সদর হাসপাতালে ছুটে আসছেন। ফলে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেড়েই চলেছে।
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী ও ওষুধের সংকট রয়েছে। তাদের ভাষ্য, একমাত্র খাবার স্যালাইন ছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে চিকিৎসার পাশাপাশি শিশুদের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য এতে বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রোগীর স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, অতিরিক্ত রোগীর চাপে ওয়ার্ড ও আশপাশের এলাকায় অপরিচ্ছন্নতা বেড়ে গেছে। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনেক রোগীকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। এতে হাম আক্রান্ত শিশুদের পাশাপাশি অন্য রোগীরাও সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত শিশুর হাঁচি-কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণ থেকে সহজেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তাই আক্রান্ত শিশুদের যথাযথভাবে আলাদা রাখা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা জরুরি। হাসপাতালেই যদি অপরিচ্ছন্নতা ও অতিরিক্ত ভিড় থাকে, তাহলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এদিকে হাসপাতালের বিভিন্ন অবকাঠামোগত সমস্যাও রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। হাসপাতালের বেশ কয়েকটি ফ্যান নষ্ট থাকায় গরমের মধ্যে শিশু ও তাদের স্বজনদের কষ্ট পোহাতে হচ্ছে। বিভিন্ন পানির ট্যাপ, লিফটসহ প্রয়োজনীয় কিছু যন্ত্রপাতিও নষ্ট হয়ে পড়ে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে চিকিৎসার পাশাপাশি মৌলিক সেবা নিয়েও ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। সীমিত জনবল দিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগী সামলাতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। একই সময়ে নতুন রোগী ভর্তি হওয়া এবং পুরোনো রোগীদের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার কারণে স্বাভাবিক সেবাব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে।
রোগীর স্বজনরা জানান, অনেক সময় চিকিৎসকের পরামর্শের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। একসঙ্গে অনেক শিশু হাসপাতালে আসায় চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। তবে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করা গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হবে বলে মনে করছেন তারা।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু জেলা সদর হাসপাতালে রোগী এনে চিকিৎসা দিলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে উপজেলা পর্যায়েই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কোন এলাকায় কতজন আক্রান্ত হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে সংক্রমণের উৎস ও বিস্তার চিহ্নিত করা জরুরি।
হামের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। যেসব শিশু এখনো নিয়মিত টিকা নেয়নি, তাদের দ্রুত টিকাদানের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, হামের প্রকোপ যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকায় জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
হঠাৎ রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালের বিদ্যমান অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী, বিশুদ্ধ পানি, সচল ফ্যান এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে রোগীদের কাঙ্খিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, নষ্ট ফ্যান ও পানির ট্যাপ দ্রুত মেরামত করা হচ্ছে না। অথচ সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই হাসপাতালের এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তারা।
একই সঙ্গে হাসপাতালে নষ্ট হয়ে যাওয়া ফ্যান, পানির ট্যাপ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দ্রুত মেরামত করা জরুরি। রোগীর স্বজনরা বলছেন, হাম থেকে সুস্থ হওয়ার জন্য হাসপাতালে এসে যেন কোনো শিশু অপর্যাপ্ত চিকিৎসা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বা প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকটে নতুন করে ঝুঁকিতে না পড়ে—এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
হবিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় হামের বর্তমান পরিস্থিতি, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা এবং সদর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশের দাবিও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এতে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র জানা যাবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।