এটিএম সালাম, নবীগঞ্জ ॥ নবীগঞ্জের যুবক রায়হান চৌধুরী (৩০) লিবিয়ায় ৯ মাস নির্যাতনের পর দেশে ফিরেছে। স্বস্থি ফিরে এসেছে তার মা-বাবাসহ পরিবারের লোকজনের মধ্যে। সে কোথায় ছিলো, কিভাবে ছিলো, কি ঘটনা ঘটেছে। তাকে প্রতিদিন বন্ধুকের নলের মুখে রেখে পরিবারের সাথে কথা বলাতো। একে ৪৭ নিয়ে তাকে পাহাড়া দিতো দুইজন। তাকে মারপিট করে কোমরের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। সারাদিনে তাকে একটি রুটি খেতে দিতো। বন্ধি অবস্থায় কখনও তাকে ভাত দিতো না। ৪০ লক্ষ টাকা মুক্তিপন দিয়েও ইতালি পৌঁছতে পারেননি রায়হান। তার পা ও হাত কেটে পঙ্গু করতে চায়। তখন এক রাতে দরজা ভেঙ্গে পালিয়ে আসতে হয়েছে।
লিবিয়া বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট অফিসের মাধ্যমে দেশে ফিরে এসেছেন। গতকাল ২৪ মে রাতে তিনি পরিবারে ফিরে আসেন। তার সাথে আরও ১৭০ জন বাংলাদেশে ফিরলেও তিনি নবীগঞ্জের একমাত্র যুবক এবং সুনামগঞ্জের আরও ৩০ জন আসছেন।
তিনি বলেন, দেশে ফিরে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হবেন। আমি এর বিচার চাই। গত রবিবার রাতে দূতাবাস ‘আউট পাস’ (জরুরি ট্রাভেল পারমিট) প্রদান এবং আইনি সহায়তায় দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়। আইওএম (আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা) দেশে ফেরার ব্যবস্থা করেন। তিনি জীবন নিয়ে দেশে ফেরার জন্য তার মধ্যে এখন স্বস্থি ফিরে এসেছে।
কথা হচ্ছিল নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি ইউনিয়নের বেতাপুর গ্রামের আবু তাহের চৌধুরীর ছেলে রায়হান চৌধুরীর সাথে। তাকে ইতালি নেয়ার কথা বলে মানব পাচার চক্র লিবিয়া নিয়ে যায়। সেখানে গত বছরের ২৫ আগষ্ট নিয়ে বন্ধি করে বিভিন্ন কিস্তিতে ৪০ লক্ষ টাকা মুক্তিপন আদায় করে। এ বিষয় নিয়ে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকাসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিউজ প্রকাশ হলে টনক নড়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়সহ আইওএম (আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা)। তাদের মাধ্যমে তিনি রবিবার রাতে দেশে ফিরে আসেন। তিনি যে হঠাৎ পরিবারের কাছে ফিরে আসবেন সেটা জানতেন না কেউ। আইওএম তারা লিবিয়ার দূতাবাসের মাধ্যমে সরাসরি বিমান ফ্লাইটে ঢাকায় নিয়ে আসেন। আবার রাতে ঢাকা থেকে গাড়ি যোগে বাড়ি পৌঁছে দেন। এর আগে তিনি দুই মাস নিখোঁজ ছিলেন। এসময় তিনি লিবিয়ার বেনগাজী জেলে ছিলেন বলে জানান। দেশে আসা যুবক রায়হান চৌধুরী জানান, আমরা একদিন রাতে সবাই মিলে পালিয়ে আসার সিন্ধান্ত নেই। আমাদেরকে একে ৪৭ নিয়ে দুইজন পাহাড়া দিতো। আমরা একটি রুমে ছিলাম ১৫ জন। তখন রাতের গভীরে হঠাৎ দেখি দুইজনের একজন খাবার আনতে গেছে আর একজন ঘুমিয়ে পড়েছে। সেই সুযোগে তাকে বেঁধে ফেলি। আমরা দরজার তালা ভেঙ্গে ফেলি। কারন আরেক জন বাহিরে তালা দিয়ে গিয়েছিল। এভাবে পালিয়ে আসলে বেনগাজীতে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেলে ছিলাম। সেখানে দুই মাস থাকার পর, পরিবারের সাথে যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়ে। জেল থেকে আইওএম এর মাধ্যমে দেশে আসি। তিনি আরও বলেন, আমাকে একে ৪৭ মাথায় রেখে বাড়িতে তাদের শিকানো ভাষায় কথা বলানো হতো। এক দুই মিনিট কথা বলতাম। এভাবে আমি প্রায় ৪০ লাখ তাদেরকে দিয়েছি কিন্তু আমাকে মুক্তি দেয়নি। আমাকে আমার বন্ধু শামীম এভাবে ফাঁদে ফেলবে ভাবতে পারি নাই। যতদিন তাদের এখানে ছিলাম কোন দিন ভাত চোখে দেখি নাই। শুধু রুটি খেয়ে বেঁচে ছিলাম। আমাকে গত বছরে আগষ্ট মাসে আমার সহপাটি শামীম প্রথমে আমাকে সৌদিতে ওমরা ভিসায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে আমাকে মিশর নিয়ে যায়, পরে মিশর থেকে লিবিয়া নিয়ে যায়। সেখানে নেয়ার পরে বিমান বন্দর থেকে শামীম আমাকে নিয়ে একটি ঘরে বন্ধি করে ফেলে। এভাবে বন্ধি অবস্থায় গত মার্চ মাসের ২৫ তারিখ পর্যন্ত তাদের জিম্মায় ছিলাম।
এদিকে মামলা সূত্রে জানা যায়, নবীগঞ্জ উপজেলার বেতাপুর গ্রামের বাসিন্দা বাদী আবু তাহের চৌধুরী ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ তারিখে নবীগঞ্জ থানায় মানব পাচার আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে তার ছেলে রায়হান চৌধুরীর সহপাটি তারা এক সাথে লেখা পড়া করেছে। এই সুত্র ধরে মোবাইলে ইতালি থেকে দালাল ও মানবপাচার চক্রের সদস্য শামীম ও তার সহযোগী রাগিব ইতালিতে ফ্রি ভিসায় নেয়ার কথা বলে তার ছেলেকে প্রলুব্ধ করেন। তাদের প্রলোভনে ইটালি যাওয়ার জন্য সম্মত হয়ে বাদী তাদেরকে পাসপোর্ট প্রদান করে। এর কয়েকদিন পর মানবপাচার চক্রের সদস্য শামীমের বাবা নজরুল ইসলাম, তার স্ত্রী হাসেনা বেগম, মেয়ে রিনু বেগম, শান্তা বেগম, রুবিনা বেগম তার বাড়িতে এসে বাদীকে জানায় যে তার ভিসা হয়েছে। তাদের কথা মতো গত ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে বাদী তাদেরকে ১০ লাখ টাকা প্রদান করেন। এর কিছুদিন পরে বাদীর ছেলে রায়হান চৌধুরীর পাসপোর্ট দেয়ার সময় দালাল রাকিব এর বাড়িেেত গিয়ে আরও নগদ ২ লাখ টাকা প্রদান করেন। টাকা পাওয়ার পর মানব পাচার চক্রের সদস্যরা ভিকটিম রায়হান চৌধুরীকে প্রথমে ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব ও পরে মিশর হয়ে লিবিয়া নিয়ে যায়। সেখানে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য শামীম ও রাকিব মিলে রায়হান চৌধুরীকে ইটালি না পাঠিয়ে জিম্মি করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। তারা রায়হান চৌধুরীর মা, বাবাসহ আত্বীয় স্বজনকে ফোন করে জানায় যে, বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাইলে কিংবা ইটালি যেতে চাইলে দেশে থাকা তাদের সদস্য নজরুল ইসলামের কাছে আরও ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে। রায়হান চৌধুরীকে মারপিট করে ভিডিও কলে দেখায়। তার একটি আঙ্গুল কেটে দিয়ে বলে তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে হাতের কবজি কেটে দিবে। তাই বাধ্য হয়ে ভিকটিমের বাবা জমি ও সোনা বিক্রি করে ১৫ লাখ টাকা দেশে থাকা পাচারকারী চক্রের সদস্যদের বিভিন্ন ব্যাংক একাউন্টে ও বিকাশের মাধ্যমে প্রদান করেন। তারা মোট ২৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা পাওয়ার পরও তারা ভিকটিমকে দেশে বা ইটালি পাঠায়নি।
এ বিষয়ে মামলার বাদী আবু তাহের চৌধুরী বলেন, আমি মামলা করে বিপাকে পড়েছি। আমি এখন আমার ছেলেকে ফিরে পেয়ে ভিষন খুশি হলেও তাদের হুমকির মুখে আছি। তারা আসামির জামিন করিয়ে দিতে ও মামলা প্রত্যাহার করার জন্য হুমকি দিচ্ছে।