স্টাফ রিপোর্টার ॥ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল মতান্তরে ৯ রবিউল আউয়াল সোমবার হাতির বছরের (সুরা ফিল) বিখ্যাত ঘটনার কিছুদিন পর মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং মাতার নাম আমিনা। জন্মের আগেই তিনি পিতৃহারা হন এবং দাদা আবদুল মুত্তালিব ও চাচা আবু তালেবের আশ্রয়ে বেড়ে ওঠেন। আল্লাহতায়ালা তাঁকে সমগ্র মানবজাতির নেয়ামত ও করুণা স্বরূপ প্রেরণ করেছেন। ইরশাদ করা হয়েছে, আর আমিতো আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য কেবল রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি (আম্বিয়া-১০৭) রসুল (সা.) সোমবার জন্মগ্রহণ করেন তাঁর প্রমাণ তিনি সপ্তাহের ওই দিন সিয়াম পালন করতেন। তাঁকে এই দিন সিয়াম পালনের কথা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এটি এমন একটি দিন যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং যেদিন আমার ওপর প্রথম ওহি অবতীর্ণ হয়েছে (সহিহ মুসলিম)। কাজেই তিনি সিয়াম পালন করে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছেন। মহানবী (সা.)-এর জন্ম নবুয়তের সূচনাতাঁর জন্মের অলৌকিক নিদর্শন: সিরাত ও হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে যে, মহানবী (সা.) এর মুহতারামা জননী বিবি আমিনা বলেন, যখন মহানবী (সা.) তাঁর গর্ভে স্থিতি লাভ করলেন তখন তাঁকে স্বপ্নে সুসংবাদ দান করা হয় যে, তোমার গর্ভে যে সন্তানটি রয়েছে তিনি এই উম্মতের সরদার। তিনি যখন ভূমিষ্ঠ হবেন, তখন তুমি এরূপ প্রার্থনা করবে-আমি এক আল্লাহর আশ্রয়ে সমর্পণ করলাম। আর তাঁর নাম রাখবে মুহাম্মদ (সা.) (সিরাতে ইবনে হিশাম)। বিবি আমিনা বলেন, মুহাম্মদ আমার গর্ভে আগমন করার পর আমি একটি উজ্জ্বল জ্যোতি দেখতে পেলাম যার ফলে বসরা নগরী ও সিরিয়ার প্রাসাদগুলো আমার দৃষ্টিগোচর হয় (সিরাতে ইবনে হিশাম)। তিনি আরও বলেন, আমি কোনো নারীকে মুহাম্মদ অপেক্ষা হালকা এবং সাধারণত নারীদের গর্ভাবস্থায় যে বমি বমি ভাব বা অবসাদ অবস্থা ইত্যাদি হয়ে থাকে অনুরূপ কিছুই আমার অনুভূত হয়নি। আরও বহু ঘটনা রয়েছে, যা ক্ষুদ্র পরিসরে বর্ণনা করার অবকাশ নেই। মহানবী (সা.)-এর জন্মের সময় পারস্যের রাজপ্রাসাদের ১৭টি গম্বুজ ভূমিকম্পে ধসে পড়ে। পারস্যের শ্বেত উপসাগর হঠাৎই শুকিয়ে যায়। পারস্যের অগ্নিকুণ্ড নিজে নিজে নিভে যায়, যা বিগত হাজার বছর ধরে মুহূর্তের জন্য নির্বাপিত হয়নি (সিরাতে মোগলতাই, পৃ.-৫) বস্তুত এ ছিল অগ্নি উপাসনা ও যাবতীয় গোমরাহির পরিসমাপ্তির ঘোষণা এবং পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যের পতনের প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে যে, মহানবী (সা.) ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় তাঁর স্নেহময়ী জননীর উদর হতে এমন একটি নুর প্রকাশিত হয় যার আলোতে উদয়াচল ও অস্তাচল আলোকিত হয়ে ওঠে। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে-মহানবী যখন ভূমিষ্ঠ হলেন তখন তিনি উভয় হাতের ওপর ভর দেওয়া অবস্থায় ছিলেন। তারপর তিনি এক মুঠি মাটি হাতে তুলে নিলেন এবং আকাশের দিকে তাকালেন (মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া)। দুগ্ধপান ও শৈশব: শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রথমে তাঁর শ্রদ্ধেয় জননী এবং এরপর আবু লাহাবের দাসী ছুওয়ায়বা স্তন্যদান করেন তারপর হালিমা সাদিয়া এই পরম সৌভাগ্যের অধিকারিণী হন (সিরাতে মোগলতাই)। পরবর্তী দুটি বছর তিনি শিশু মুহাম্মদকে দুধ পান করিয়ে দুই বছর পূর্ণ হওয়ায় দুধ পান ছাড়িয়ে দেন (আস-সালিহাত)। বিবি হালিমা বর্ণনা করেন যে, আমি যে সময় শিশু মুহাম্মদকে দুধ ছাড়ালাম তখন তাঁর পবিত্র জবান থেকে এই কটি কথা উচ্চারিত হয়েছিল: আল্লাহু আকবার কাবিরা ওয়াল হামদুলিল্লাহি কাছিরা ওয়া সুবহান্নাল্লাহি বুখরাতাও ওয়া আছিলা। এটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম বাক্য। বায়হাকি ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণনা করেছেন (খাসায়েসুল কুবরা প্রথম খণ্ড)। আবু উবামা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি একবার রসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রসুল আপনার নবুয়তের সূচনা কীভাবে হয়। জবাবে তিনি বললেন, আমি আমার পিতা ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের দোয়া : হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে এক রসুল প্রেরণ করিও যে তোমার আয়াতসমূহ তাদের কাছে পাঠ করিবে এবং তাদের কিতাব ও হিকমত (সুন্নাহ) দেবে এবং তাদের পবিত্র করিবে তুমি তো পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় (বাকারা, আয়াত-১২৯) এবং আমার ভাই ঈসা (আ.)-এর সুসংবাদ- আমার পরে আহমদ নামে যে রসুল আসবেন আমি তার সুসংবাদদাতা (সাফ-৬)। অগণিত সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর। হে আল্লাহ তুমি আমাদেরকে তোমার কিতাব ও রসুল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণে মৃত্যু পর্যন্ত চলার তৌফিক দান করো। লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক