শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৭ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
নোয়াপাড়া থেকে অপহৃত স্কুলছাত্র সিলেটে উদ্ধার নবীগঞ্জে বর্নাঢ্য আয়োজনে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী পালন নবীগঞ্জে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম কাউন্সিল সম্পন্ন ॥ সভাপতি মাওঃ রুহুল আমিন সম্পাদক মাওঃ ওয়াজিদ আলী শহরে ৭ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার তেলবাহী লরির ট্যাংকার থেকে ৯২ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্ততার ৩ সিলেট রেঞ্জের নতুন ডিআইজি জাহাঙ্গীর হোসেনের যোগদান মাধবপুরে চা বাগান থেকে বাচ্চা বানর উদ্ধার ॥ রঘুনন্দন রেঞ্জে অবমুক্ত স্বপ্ন সোসাইটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত মাধবপুরে শিক্ষিকার বদলির প্রতিবাদে মানববন্ধন ॥ শিক্ষার্থীদের হট্টগোল সাংবাদিক আইয়ুব খানের মায়ের মৃত্যু

ইসলামে সিন্ডিকেট ও মজুদদারি কেন ভয়াবহ অপরাধ-মুফতি ওমর বিন নাছির

  • আপডেট টাইম শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বা পড়া হয়েছে

এক্সপ্রেস ডেস্ক ॥ একজন ব্যবসায়ী যখন ন্যায্য মুনাফার আশায় পণ্য কেনেন, তা সংরক্ষণ করেন এবং উপযুক্ত সময়ে বাজারজাত করেন তা স্বাভাবিক ব্যবসার অংশ। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, দাম বাড়ার অপেক্ষায় বাজারে পণ্য ছাড়ে না এবং শেষ পর্যন্ত অসহায় মানুষের দুর্ভোগকে নিজের অতিরিক্ত মুনাফার মাধ্যম বানায়, তখন সেটি আর সাধারণ ব্যবসা থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে মজুদদারি ও জুলুম। আধুনিক বাজার ব্যবস্থায় এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে অনেক সময় ‘সিন্ডিকেট’ বলা হয়। ইসলামী পরিভাষায় এর সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ধারণা হলো ‘ইহতিকার’ —অর্থাৎ মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা এবং মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নেওয়া। আরবি ভাষার প্রাচীন অভিধান আল-আইন-এ খলিল ইবনু আহমদ আল-ফারাহিদি (রহ.) বলেন, খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যজাতীয় সামগ্রী জমা করে রাখাকে ইহতিকার বলা হয়। অর্থাৎ, মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যাশায় খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করাকে মজুদদারি বলা হয়। হাফেজ ইবনু হাজার আসকালানি (রহ.)-এর ব্যাখ্যায়, মানুষ প্রয়োজনমুক্ত থাকা সত্ত্বেও যখন অন্য মানুষের প্রয়োজনের সময় খাদ্যদ্রব্য বিক্রি না করে মূল্যবৃদ্ধির অপেক্ষায় তা আটকে রাখে, সেটিই মজুদদারির অন্তর্ভুক্ত। (ফাতহুল বারি, ৪/৪৪০)
অতএব, শুধু কোনো পণ্য সংরক্ষণ করলেই তা মজুদদারি বা ইহতিকার হয়ে যায় না। বরং মানুষের প্রয়োজনকে পুঁজি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অতিরিক্ত মুনাফার উদ্দেশ্যে পণ্য আটকে রাখাই মূল অপরাধ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর এর প্রভাব পড়ে সবচেয়ে বেশি। বাজারে কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ কমে গেলে তার দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। তখন সীমিত আয়ের মানুষকে একই পণ্য আগের তুলনায় অনেক বেশি দামে কিনতে হয়। একদিকে মানুষের আয় সীমিত, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। ফলে সংসারের ব্যয় সামলাতে গিয়ে মানুষকে খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে কাটছাঁট করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে মানুষকে সরকারি স্বল্পমূল্যের পণ্য সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতেও দেখা যায়। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মানুষের অসহায়ত্বকে কাজে লাগানো তাই নিছক ব্যবসায়িক অনিয়ম নয়; এটি সামাজিক অন্যায়। ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্য ও মুনাফাকে নিষিদ্ধ করেনি। বরং হালাল ব্যবসাকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু এমন ব্যবসা, যার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে যায় এবং তাদের প্রয়োজনকে কাজে লাগিয়ে অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জন করা হয়, ইসলাম তা অনুমোদন করে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পাপিষ্ঠ ব্যক্তি ছাড়া কেউ মজুদদারি করে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬০৫) এই সংক্ষিপ্ত হাদিসেই মজুদদারির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে যায়। কারণ মজুদদার নিজের লাভের জন্য অসংখ্য মানুষের প্রয়োজনকে সংকটে পরিণত করে। ইসলামে সব ধরনের পণ্য সংরক্ষণ হারাম নয়। একজন ব্যবসায়ী ভবিষ্যৎ চাহিদার কথা চিন্তা করে বৈধভাবে পণ্য কিনে রাখতে পারেন। কিন্তু মজুদদারি হারাম হওয়ার প্রধান কারণ হলো জনসাধারণের ক্ষতি করা। যেমন ১. পণ্যের দাম কম থাকা অবস্থায় বিপুল পরিমাণে কিনে রেখে দাম বাড়ার অপেক্ষা করা এবং এর ফলে বাজারে সংকট সৃষ্টি হওয়া। ২. কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এমনভাবে গুদামজাত করা, যাতে সাধারণ ক্রেতারা বাজারে তা সহজে না পান। ৩. মানুষের তীব্র প্রয়োজনের সময়ও পণ্য বাজারে না ছেড়ে কৃত্রিম সংকট বজায় রাখা। ৪. বাজারে সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিতভাবে পণ্য আটকে রেখে মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া। ৫. একাধিক ব্যবসায়ী যোগসাজশ করে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ করা। এসব কর্মকাণ্ডে মানুষের অধিকার ক্ষুন্ন হয় এবং সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ে। মজুদদারির ধারণা শুধু খাদ্যপণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় আধুনিক বাজারে মানুষের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রেও এর অনুরূপ চর্চা দেখা যেতে পারে। যেমন, কোনো গুরুত্বপূর্ণ সেবার টিকিট বা আসন কৃত্রিমভাবে আটকে রেখে পরে সংকটের সময় অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা। মানুষের জরুরি প্রয়োজনকে পুঁজি করে অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করাও ইসলামের ন্যায়নীতি ও আমানতদারির আদর্শের পরিপন্থী। মজুদদারির ব্যাপারে হাদিসে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি খাদ্যদ্রব্য মজুদ করে রাখে, সে অভিশপ্ত।’ (সহিহ বুখারি) ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার। একজন ব্যবসায়ী লাভ করবেন—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই লাভ যেন অন্যের ক্ষতির কারণ না হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা হলে তা ভিন্ন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯) এই আয়াত ব্যবসার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মতি ও ন্যায়নীতির গুরুত্ব তুলে ধরে। মানুষের দুর্বলতা, অসহায়ত্ব কিংবা জরুরি প্রয়োজনকে কাজে লাগিয়ে অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জন এই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্যদিকে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সৎকর্ম ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকর্ম ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯০) মজুদদারি প্রতিরোধ শুধু ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব নয়; বাজারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, কৃত্রিম সংকট শনাক্ত করা, যোগসাজশ মূলক বাজার নিয়ন্ত্রণ প্রতিরোধ করা এবং ভোক্তার অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। কারণ বাজারে অন্যায়ভাবে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ। অতএব, ইসলাম মানুষের প্রয়োজনকে ব্যবসায়িক প্রতারণার হাতিয়ার বানানোর অনুমতি দেয়নি। হালাল ব্যবসায় লাভ আছে, কিন্তু সেই লাভ হতে হবে ন্যায়সঙ্গত; মানুষের কান্না, দুর্ভোগ ও অসহায়ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে অর্জিত মুনাফা কখনো প্রকৃত বরকত বয়ে আনতে পারে না।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2013-2021 HabiganjExpress.Com
Design and Development BY ThemesBazar.Com