স্টাফ রিপোর্টার ॥ হবিগঞ্জে তাওহীদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও আত্মসাতের মামলা জ্বিনের হাজিরার নামে অলৌকিক শক্তি প্রদর্শন করে ১ হাজার ভরি স্বর্ণালংকার দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের পরিবারের কাছ থেকে টাকা, জমি ও ব্যাংকের স্বাক্ষরিত চেক নেওয়ার অভিযোগে হবিগঞ্জে চৌধুরী তাওহীদ বিন আজাদ (তাওহীদ/ইমন) নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
শায়েস্তাগঞ্জের উবাহাটা এলাকার মোঃ আমিনুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি বাদী হয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলার নম্বর ২৩, তারিখ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। মামলায় প্রতারণা, অন্যের রূপ ধারণ, বিশ্বাসভঙ্গ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বাদী মোঃ আমিনুল ইসলাম উল্লেখ করেন, জামেয়া রশিদিয়া বাঘজুর মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করার সময় বাঘজুর গ্রামের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (ধনু মিয়া) নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে অভিযুক্ত চৌধুরী তাওহীদ বিন আজাদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে গোবিন্দপুর দারুস সুন্নাহ মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করার সময় তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।
এজাহার অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাদীর স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি হলে তিনি পিত্রালয়ে চলে যান। স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য বাদী অভিযুক্তের সহযোগিতা চান। এ সময় অভিযুক্ত নিজেকে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী দাবি করে ২১ দিনের মধ্যে তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন। পরে অভিযুক্তের কথিত আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় বিশ্বাস স্থাপন করেন বাদী।
বাদীর অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি তার বাড়িতে অবস্থান করে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতেন এবং এক পর্যায়ে ‘জ্বিনের সঙ্গে যোগাযোগ’ করার কথা বলেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাদীর বাড়িতে কথিত ‘জ্বিনের হাজিরা’ আয়োজন করা হয়। এ সময় বাদীকে বিভিন্ন শর্ত দেওয়া হয় এবং জ্বিনের মাধ্যমে প্রথমত ৫০০ ভরি স্বর্ণের ‘হাদিয়া’ দেওয়ার কথা বলা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, কথিত জ্বিনের নির্দেশ অনুযায়ী প্রথমে ২৫ লাখ টাকা দিতে বলা হয়। টাকা দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় বাদীর মায়ের মালিকানাধীন জমি বিক্রির কথা বলা হয়। পরে শায়েস্তাগঞ্জের পুরান বাজার এলাকার এক ক্রেতার কাছে ১২ শতক জমি ২৪ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। বাদীর দাবি, জমি বিক্রির পর সমস্ত টাকা দুই বারে অভিযুক্তের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এরপর কথিত জ্বিনের নামে আরও টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন বাদী। ১৭/১২/২০২৩ তারিখে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে চুক্তিনামা সম্পাদন করে ৩৫ লাখ টাকার একটি চেকসহ আরও একটি স্বাক্ষরিত ব্ল্যাংক চেক অভিযুক্ত গ্রহণ করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, পরবর্তীতে আরও অর্থের জন্য তার মায়ের মালিকানাধীন জমি বিক্রি এবং অভিযুক্তের নামে জমি ‘জামানত’ হিসেবে রেজিস্ট্রি করতে বলা হয়। এভাবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ৩টি দলিলের মাধ্যমে মোট ২৮ শতক এবং পরে আরও ১টি দলিলে ৪২ শতক জমি অভিযুক্তের নামে ‘জামানত’ হিসেবে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয় বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ ও ২৫ সালের দিকে বাদীর মায়ের নামে থাকা শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজ সংলগ্ন আরও ১৯ শতক জমি দুই বারে বিক্রি করে প্রথমে ১০শতক ২৮ লাখ ও পরে ০৯ শতক ২৭ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। এ ছাড়াও মোটর সাইকেল কেনার নিমিত্তে লেঞ্জাপাড়া মৌজার ১.৪০ শতক জমি বিক্রি করে মোট ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। এর সমস্ত টাকা আসামির হাতে দেয়া হয়।
বাদীর দাবি, কথিত জ্বিনের হাজিরার মাধ্যমে বারবার অর্থ দাবি করা হলেও প্রতিশ্রুত ১ হাজার ভরি স্বর্ণ তিনি পাননি। বরং ০৩/০২/২০২৬ কথিত হাজিরায় তাকে ৩০/০৬/২৬ ইং এর মধ্যে ১ হাজার ভরি স্বর্ণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। এরপর ২৩/০৬/২৬ ইং আবারও কথিত ‘জ্বিনের হাজিরা’ অনুষ্ঠিত হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ সময় বাদীর কাছ থেকে তার নিজের ব্যাংক হিসাবের বিপরীতে ১০টি এবং তার মা সুফিয়া খাতুনের ব্যাংক হিসাবের বিপরীতে ৪টি ব্ল্যাংক চেক নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার মায়ের নামে আগে কোনো ব্যাংক হিসাব না থাকায় ২৯/০৬/২০২৬ তারিখে হবিগঞ্জ শাখা সিটি ব্যাংকে হিসাব খোলা হয় এবং ৪টি চেকে তার মায়ের টিপসই নিয়ে অভিযুক্তের কাছে দেওয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে অভিযুক্ত তার কাছ থেকে আরও ৮৫ হাজার টাকা নগদ গ্রহণ করেন বলেও অভিযোগ করেছেন বাদী।
এজাহারে বাদী আরও বলেন, ০৫/০৭/২০২৬ রাতে তিনি ৩০০ টাকার নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্প নিয়ে হাফেজ মাওলানা নূরুল আমিন নাইমুল হাসানকে সঙ্গে করে হবিগঞ্জের ‘নূরুল হেরা জামে মসজিদ মার্কেটে’ যান। সেখানে ‘নুসাইবা মিডিয়া’ নামের দোকানে তার দাবি-দাওয়া উল্লেখ করে তিনটি নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে একটি অঙ্গীকারনামা তৈরি করা হয়। এতে অভিযুক্ত চৌধুরী তাওহীদ বিন আজাদ অঙ্গীকারকারী হিসেবে স্বাক্ষর করেন বলে মামলার এজাহারে দাবি করা হয়েছে। সাক্ষী হিসেবে হাফেজ মাওলানা মুহিবুর রহমান, হাফেজ মাওলানা নূরুল আমিন নাইমুল হাসান ও মোঃ আহমুদুল হক স্বাক্ষর করেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, ওই অঙ্গীকার নামায় দেড় মাসের মধ্যে তার কথিত ‘হাদিয়া’ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরে ২০/০৮/২০২৬ তারিখে অভিযুক্তের আইনজীবী স্বাক্ষরিত একটি লিগ্যাল নোটিশ পান তিনি। সেখানে ৩৫ লাখ টাকা পাওনার দাবি করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে ০১/০৯/২৬ একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয় বলে বাদী জানান। তার মা সুফিয়া খাতুন, ভাই জামিল আহমদ, হাফেজ নূরুল আমিন নাইমুল হাসান ও হাফেজ মুহিবুর রহমান সহ কয়েকজন ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বাদীর অভিযোগ, বৈঠকে অভিযুক্ত তার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও পরে অঙ্গীকারনামার স্ট্যাম্প ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করেন। উপস্থিত লোকজন তার কাছ থেকে ছেঁড়া স্ট্যাম্পগুলো উদ্ধার করেন বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
বাদী আরও অভিযোগ করেন, ওই রাতেই ‘নূরুল হেরা জামে মসজিদ’ মার্কেটের সামনে অভিযুক্তকে আটকে চেক ও জমি ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করা হলে তিনি সব লেনদেন অস্বীকার করেন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। অভিযুক্তের কাছে থাকা চেক ব্যবহার করে তাকে ও তার মাকে দীর্ঘদিন জেলে পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও দাবি করা হয়, অভিযুক্ত প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তি অন্যত্র বিক্রির চেষ্টা করছেন। এ কারণে বাদী হবিগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে অভিযোগ এবং থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
মামলার এজাহারে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া অর্থ দিয়ে তিনি হবিগঞ্জের রাজনগর কবরস্থানের পাশে একটি বাসা ও মোটরসাইকেল কিনেন এবং বাইপাস সড়কের আনোয়ারপুর পয়েন্টে একটি হার্ডওয়্যার দোকান গড়ে তোলেন। এছাড়া সুনামগঞ্জের দিরাই থানার টুকদিরাই এলাকায় ‘তৌহিদ সমন্বিত এগ্রো ফার্ম’ গড়ে তোলার কথাও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদী তার অভিযোগের সমর্থনে দলিল, ব্যাংক লেনদেনের বিবরণী, অঙ্গীকারনামা, সালিশ বৈঠকের ভিডিও, কল রেকর্ড ও অন্যান্য নথি তদন্তকারী সংস্থার কাছে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত চৌধুরী তাওহীদ বিন আজাদের বক্তব্য জানা যায়নি।