মখলিছ মিয়া ॥ হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য মরণোত্তর দেহ দান করেছেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট নেতা লিটন দাশ তালুকদার। প্রয়াত লিটন দাশ নবীগঞ্জ উপজেলার শিবপাশা গ্রামের মৃত দ্বিজেন্দ্র দাশ তালুকদার ও রেখা রাণী দাশের পুত্র। লিটন দাশ তালুকদারের দুইটি কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর গত রবিবার সকাল ১১টায় নবীগঞ্জ পৌর এলাকার শিবপাশায় নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি ছাত্র জীবনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন মৃত্যুর পরে তাঁর দেহটি না জ্বালিয়ে বা না পঁচিয়ে যদি মানব কল্যাণে ব্যবহার হয় তাহলেই জীবনের কিছুটা স্বার্থক হবে। তাঁর দেহ ও বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গবেষণা করে অনেক মেডিকেল শিক্ষার্থী বড় ডাক্তার হয়ে সমাজের চিকিৎসা সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারবে। এতে মানবজাতি অনেক উপকৃত হতে পারে। তাই সামাজিক বিভিন্ন বাস্তবতা কে অতিক্রম করে এমন সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এটাই সম্ভবত হবিগঞ্জ জেলার কোনো ব্যক্তি মরণোত্তর দেহ দান করেছেন এবং হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজেরও প্রথম কোনো মরনোত্তর দেহ প্রাপ্তি। লিটনের একমাত্র বড় ভাই দিপু চন্দ্র দাশ তালুকদারও ছাত্রজীবনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র করতেন এবং বর্তমানে বাসদ নবীগঞ্জ উপজেলা কমিটির সদস্য। তিনি জানান, লিটন দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে গত ১৩ আগস্ট একটি নোটারীকৃত ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে তাঁর মৃত দেহ যেন হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণা কাজে ব্যবহৃত হয়, এই মর্মে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে ঘোষণাপত্রটি হস্তান্তর করে। এর একমাস পর গত ১৩ সেপ্টেম্বর সকালে লিটনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার সাথে সাথে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জাবেদ জিল্লুল বারি, এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুপার্থ ভট্টাচার্য্য, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব, হিসাব রক্ষক সূর্য লাল রায়, ক্যাশিয়ার নারায়ন পাল, লিটন দাশের বড় ভাই দিপু দাশ, বাসদ হবিগঞ্জ জেলা কমিটির সদস্য সচিব শফিকুল ইসলাম ও এডভোকেট সবুজ দাশের দিন ব্যাপী আন্তরিক প্রচেষ্টায় মৃত দেহ হস্তান্তরে জেলা প্রশাসনের অনুমতিসহ আইনী প্রক্রিয়া সম্পাদন করেন। আইনী পক্রিয়া শেষে ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টায় লিটন দাশের বড় ভাই দিপু দাশ ও তাঁর আত্মীয়-স্বজনরা মৃত দেহটি হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। মেডিকেল কলেজের পক্ষ থেকে এ সময় ফ্রজেন এম্বুলেন্সসহকারে নবীগঞ্জে উপস্থিত ছিলেন এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুপার্থ ভট্টাচার্য্য, প্রধান টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব, হিসাব রক্ষক সূর্য লাল রায়, ক্যাশিয়ার নারায়ণ পাল। মৃত দেহ হস্তান্তরের পূর্বে বাসদ হবিগঞ্জ জেলা ও নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার পক্ষ থেকে তাঁর কর্ম ও স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করে লাল সালাম দেয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাসদ নবীগঞ্জ উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক চৌধুরী ফয়সল সুয়েব, বাসদ হবিগঞ্জ জেলা কমিটির সদস্য সচিব শফিকুল ইসলাম, বাসদ নবীগঞ্জ উপজেলা কমিটির সদস্য কাঞ্চন চক্রবর্ত্তী, দিপু চন্দ্র দাশ তালুকদার, তমাল ভট্টাচার্য, নরেন্দ্র পাল, কুমারেশ চক্রবর্তী, কংকন চক্রবর্তী, জয় চক্রবর্ত্তী প্রমূখ। শ্রদ্ধা নিবেদনকালে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ বলেন, লিটন দাশের এমন পরোপকারী সাহসী সিদ্ধান্ত আমাদেরকেও মানবিক হওয়ার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা জোগাবে। মানুষ মরে গিয়েও তাঁর চোখ, কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদপিন্ডসহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করে জীবিত মানুষের ব্যবহারে ভূমিকা রাখতে পারেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে তা অনেক সহজ ও মানুষের সামর্থ সীমায় চলে এসছে। এসব ক্ষেত্রে সামাজিক বাধা-বিপত্তি থাকলে সমাজের অগ্রসরমান চিন্তার ব্যক্তিবর্গকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা দরকার। মেডিকেল কলেজের পক্ষ থেকে প্রধান টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব বলেন, আমাদের দেহ পঁচনশীল, কর্মটাই মূল। লিনট দাশ সেই মূল কাজটিই করে গেছেন। যে কারনে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ পরিবার অজীবন তাঁর মানবিক অবদানের কথা স্মরণ রাখবে।