স্টাফ রিপোর্টার ॥ একসময় ট্রেনের হুইসেল আর যাত্রীদের পদচারণায় মুখর থাকত মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া রেলস্টেশন। লোকাল ও আন্তঃনগর ট্রেনের পাশাপাশি মালবাহী ট্রেনও নিয়মিত থামত এখানে। চা বাগানের পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে স্থানীয় মানুষের যাতায়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল স্টেশনটির। এখন সেই তেলিয়াপাড়া রেলস্টেশন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় স্টেশন চত্বর পরিণত হয়েছে জঙ্গল ও আবর্জনায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, জনমানবহীন এই স্টেশনটি বর্তমানে অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রভাবশালীদের দখলে গেছে স্টেশনের অনেক জায়গা। তারা দোকান দিয়ে ব্যবসা করছেন। প্রায় ১২৮ বছরের বেশি পুরোনো স্টেশনটি বন্ধ করে দেয়ায় যাত্রী ছাউনিসহ রেলওয়ের বিভিন্ন স্থাপনা অযত্ন-অবহেলায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। চারপাশে গজিয়েছে ঝোপঝাড় ও জঙ্গল। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা হয়ে পড়ে নির্জন। ফলে সাধারণ মানুষও সেখানে যেতে ভয় পান বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় তেলিয়াপাড়া রেলস্টেশন ছিল মাধবপুর ও চুনারুঘাটের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। স্টেশনটিতে উল্কা, কুশিয়ারা, বাল্লা লোকালসহ বিভিন্ন ট্রেনের পাশাপাশি আন্তঃনগর ও মালবাহী ট্রেনও যাত্রাবিরতি করত। মাধবপুর ও চুনারুঘাটের অন্তত ২২টি চা বাগানের শ্রমিক-কর্মচারীসহ সাধারণ মানুষ এই স্টেশন ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করতেন।
১৮৯৬ সালে ব্রিটিশ আমলে জনসাধারণের যোগাযোগ এবং সিলেট অঞ্চলের চা-বাগানগুলোর উৎপাদিত পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে তেলিয়াপাড়া রেলস্টেশন চালু করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় ধরে এ স্টেশনকে ঘিরে গড়ে ওঠে ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনবসতি। চা বাগানের উৎপাদিত পণ্যও একসময় রেলপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হতো।
তেলিয়াপাড়া স্টেশন বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক দশক আগেও স্টেশন এলাকায় মানুষের ব্যাপক সমাগম ছিল। প্রতিদিন বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার জন্য যাত্রীরা ট্রেনের অপেক্ষায় থাকতেন। মালবাহী ট্রেনের মাধ্যমে চা বাগানের পণ্যও পরিবহন করা হতো। কিন্তু সড়ক যোগাযোগের বিস্তার এবং রেলওয়ের অব্যবস্থাপনার কারণে ধীরে ধীরে স্টেশনটির গুরুত্ব কমতে থাকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলায়ও স্টেশন চত্বর অনেকটা জনশূন্য থাকে। আর সন্ধ্যার পর সেখানে সাধারণ মানুষের চলাচল প্রায় নেই বললেই চলে। পরিত্যক্ত ভবন, ঝোপঝাড় ও অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে মাদকসেবনসহ নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, শুধু ঐতিহ্য রক্ষার জন্য নয়, মাধবপুর ও চুনারুঘাটের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করা, চা শিল্পের পণ্য পরিবহন এবং স্টেশন এলাকাকে অপরাধ ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডমুক্ত করতে দ্রুত তেলিয়াপাড়া রেলস্টেশন পুনরায় চালু করা প্রয়োজন।