এসএম সুরুজ আলী ॥ হবিগঞ্জে জরাজীর্ণ ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে যেন কোন বিদ্যালয়ের ভবনের ছাদ ধসে হতাহতের ঘটনা আশংকা করছেন শিক্ষক/শিক্ষার্থীরা।
হবিগঞ্জ জেলার ৯টি উপজেলায় ১ হাজার ৫২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ২৫৯টি বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনের ছাদ থেকে ধ্বসে পড়ছে ঢালাই। কোথায়ও আবার দেওয়ালে ফাটল। এর মধ্যে ২০টি ভবনকে চিহ্নিত করা হয়েছে অতি ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকা এসব বিদ্যালয়ের অধিকাংশগুলোতে ২৫ বছরেও নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়নি। ঝুকিপূর্ণ এসব ভবনে ক্লাস করছেন ৩ হাজার শিক্ষার্থী। সম্প্রতি সদর উপজেলার গৌরাঙ্গের চক বাবুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি কার্যক্রম চলাকালে ভবনের ছাদের একটি অংশ ধসে পড়েছে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। অল্পের জন্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়গুলো ভবন দীর্ঘদিন ধরেই জরাজীর্ণ। ভবনগুলো সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কারণে জীবনে ঝুঁকি নিয়ে চলছে পাঠদান কার্যক্রম। নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বহু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একই ধরনের জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম গৌরাঙ্গের চক বাবুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৯৫ জন শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে। প্রায় ৩৪ বছর আগে নির্মিত ভবনের ছাদ থেকে সম্প্রতি পলেস্তারা খসে পড়ে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সাদি আহত হয়। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোয়ারা বেগম বলেন, পরীক্ষা চলাকালে হঠাৎ ছাদের অংশ ভেঙে পড়ে সাদি আহত হয়। এখন প্রতিদিন চরম আতঙ্ক নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসতে হয়।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাজমা আক্তার জানায়, ঝড়-তুফানের সময় ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কায় তারা অনেক সময় পাশের বিদ্যালয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়। অন্যদিকে, জেলার প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম সোমেশ্বরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপঙ্কর রায় বলেন, ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে সর্বশেষ ১৯৯৪ সালে ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমানে ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে, বৃষ্টির সময় ভেতরে পানি পড়ে এবং ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের কারণে দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।
হবিগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৯টি উপজেলায় মোট ১ হাজার ৫২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ২৫৯টি বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বিদ্যালয়ের অধিকাংশ ভবন দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং প্রায় ২৫ বছরেও সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়নি। এর মধ্যে ২০টি বিদ্যালয় ভবনকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উপজেলাভিত্তিক অতি ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলো হলো- হবিগঞ্জ সদরে ৩টি, লাখাইয়ে ৩টি, বাহুবলে ৩টি, নবীগঞ্জে ২টি, বানিয়াচংয়ে ১টি, আজমিরীগঞ্জে ১টি, মাধবপুরে ৩টি, চুনারুঘাটে ৩টি এবং শায়েস্তাগঞ্জে ১টি। এই ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। তবে বিদ্যালয়গুলো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ।
এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহ আলম জানান, জেলার যেসব বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, সেসব বিদ্যালয়ে আগামী অর্থবছরে নতুন ভবন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বড় কোন দুর্ঘটনা আগেই ঝঁকিপূর্ণ ভবনগুলো সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ করে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ গড়ার দাবি স্থানীয়দের।