স্টাফ রিপোর্টার ॥ আজমিরীগঞ্জে গৃহবধূ জাকিয়া সুলতানা তন্নী হত্যা মামলায় হাইকোর্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পাওয়া সাত আসামির মধ্যে ৪ জনের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। গতকাল রোববার (১১ অক্টোবর) হবিগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক এ আদেশ দেন। কারাগারে পাঠানো চার আসামি হলেন নিহত তন্নী হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও তার স্বামী বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য জিল্লুর রহমানের বড় ভাই আজমিরীগঞ্জ পৌর যুবদলের সদস্যসচিব মো. আতিকুর রহমান, ছোট ভাই পুলিশ কনস্টেবল মো. ইবাদুর রহমান ইবাদ, বাবা মুজিবুর রহমান এবং মা মোছা. হোসনে আরা বেগম।
মামলার নথি ও বাদীপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে তন্নীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। এ ঘটনায় তাঁর স্বামী বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য জিল্লুর রহমানসহ শ্বশুরবাড়ির সদস্যের বিরুদ্ধে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই মুসলিম শরিয়াহ ও প্রচলিত রীতিনীতি অনুযায়ী জিল্লুর রহমানের সঙ্গে শিবপাশা গ্রামের বং মহল্লার মৃত মখলিসুর রহমানের মেয়ে জাকিয়া সুলতানা তন্নীর বিয়ে হয়। বিয়ের সময় কাবিননামা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি কনের পরিবার থেকে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক সামগ্রীসহ বিভিন্ন উপহার দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আরও যৌতুকের দাবিতে নিহত তন্নীর ওপর তার স্বামী ও শ্বশুড়বাড়ির লোকজন চাপ সৃষ্টি করে বলে মামলার বাদী তন্নীর ভাই মাসহুদ কবির নিহাদ মামলায় অভিযোগ করেন।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, তন্নীকে তাঁর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা বিভিন্ন সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। বিয়ের কয়েক মাস পরও সন্তান না হওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁকে অপমান ও নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি গর্ভধারণের বিষয় নিয়েও তাঁকে মানসিক চাপে রাখা হয়েছিল বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, গত ২৬ জুলাই সকালে স্বামীর শয়ন কক্ষ থেকে তন্নীকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাকে নির্যাতন করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর আগে এদিন সকাল আনুমানিক ৮টা ৪৮ মিনিটে তাঁর মায়ের সঙ্গে শেষবারের মতো মোবাইল ফোনে কথা হয়। ওই কথোপকথনে তন্নী নির্যাতনের বিষয়ে অভিযোগ করেছিলেন বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। পরে সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়ার খবর জানানো হয়। ঘটনার পর নিহতের স্বজনেরা ঘটনাস্থলে গেলে তাঁদেরকে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে আজমিরীগঞ্জ থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
মামলার বাদীপক্ষের দাবি, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, মরদেহের আঘাতের চিহ্ন এবং বিভিন্ন আলামত যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। তাঁদের অভিযোগ, ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন নিহত তন্নীর ছোট ভাই ও মামলার বাদি নিহাদ।
মামলার নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার পর অভিযুক্ত আসামিদের ভূমিকা, তাঁদের পারস্পরিক যোগাযোগ, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, ডিজিটাল তথ্য এবং ঘটনাস্থলের আলামত পরীক্ষা করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের প্রয়োজন। বাদীপক্ষ এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আবেদন জানিয়েছেন আদালতের কাছে।
আদালতে গতকাল রবিবার জামিন শুনানি শেষে সাত আসামির মধ্যে চারজনের জামিন নামঞ্জুর করে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আর মামলার প্রধান আসামি নিহত তন্নীর স্বামী বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য জিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীতে বিভাগীয় তদন্ত চলছে। নৌবাহিনীর অভ্যন্তরে তাকে নজর বন্দী হিসেবে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। মামলায় গতকাল বাদীপক্ষে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অ্যাডভোকেট এ টি এম জিল্লুর রহমান চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট মঞ্জুর উদ্দিন আহমেদ শাহিন। আসামিপক্ষে রয়েছেন অ্যাডভোকেট কবির উদ্দিন ও অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম।