শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন

বানিয়াচংয়ে দুই দিনের ব্যবধানে সংঘর্ষে ঝরল দুটি তাজা প্রাণ ॥ গ্রাম্য দাঙ্গা রোধে জোরালো পদক্ষেপ নেয়ার দাবী

  • আপডেট সময় বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫০০ বার পড়া হয়েছে

মখলিছ মিয়া ॥ বানিয়াচংয়ে রক্তক্ষয়ী গ্রাম্য দাঙ্গার বিষবাষ্প যেন কিছুতেই থামছে না। তুচ্ছ ঘটনা আর আধিপত্য বিস্তারের জেরে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ঝরে গেল দুটি তাজা প্রাণ। নিহতরা হলেন কাঠখাল গ্রামের রজব আলী এবং খাগাউড়া ইউনিয়নের তাহের মিয়া। এই জোড়া খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যথারীতি শুরু হবে মামলা-মোকাদ্দমা, এলাকা ছাড়া হওয়ার আতঙ্ক। স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও আধিপত্যের এই নির্মম খেলায় রজব আলী ও তাহের মিয়ার সলিল সমাধির পর স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন প্রতি মাসেই তো উপজেলায় ঘটা করে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা হয়, নেওয়া হয় দীর্ঘমেয়াদী নানা পরিকল্পনা। কিন্তু বাস্তবে সেই সিদ্ধান্তের সুফল কতটুকু পাচ্ছে সাধারণ মানুষ ? নাকি এসব সিদ্ধান্ত কেবলই ফাইলবন্দী হয়ে রয়ে যাচ্ছে কাগজের পাতায় ?। অনুসন্ধানে দেখা যায়, বানিয়াচং উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় প্রতি মাসেই দাঙ্গারোধ, টেঁটা ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার এবং জুয়া-মাদক নির্মূল নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও রেজুলেশন পাস হয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এর দৃশ্যমান কোনো প্রতিফলন নেই। বারবার সিদ্ধান্ত হওয়া সত্ত্বেও কেন উপজেলা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মণ দেশীয় অস্ত্র (যেমন: টেঁটা, ফিকল, বল্লম, ঢাল) উদ্ধার করা হচ্ছে না, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের ঢিলেঢালা অভিযানের কারণে দাঙ্গাবাজরা খুব সহজেই বিশাল অস্ত্রের মজুদ গড়ে তুলছে এবং সামান্য উস্কানি বা বিরোধেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। যার সর্বশেষ নির্মম শিকার হলেন কাঠখালের রজব ও খাগাউড়ার তাহের। বানিয়াচংয়ের প্রতিটি দাঙ্গার পেছনে এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মহল ও তথাকথিত “দাঙ্গাবাজ মাতব্বর” কলকাঠি নাড়ে। তারা নিজেরা সরাসরি মাঠে না নামলেও সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষকে উস্কে দিয়ে রণক্ষেত্রে পাঠায়। আর সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটার পর শুরু হয় আসল খেলা। মামলায় প্রকৃত অপরাধীদের পাশাপাশি গ্রামের অনেক নিরীহ মানুষদেরও আসামি করা হয়। ফলে একদিকে মূল অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, অন্যদিকে নিরীহ মানুষ হয়রানি ও গ্রেফতার এড়াতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়ায়। এই সুযোগে চলে মামলার নাম কাটা ও বাণিজ্যের নোংরা খেলা, যা গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক শান্তিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। এই ভয়াবহ ব্যাধি থেকে বানিয়াচংয়ের সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে হলে শুধু আনুষ্ঠানিক সভা নয়, প্রয়োজন কঠোর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। বানিয়াচংয়ের প্রতিটি গ্রামে অবিলম্বে বিশেষ যৌথ অভিযান চালিয়ে সব ধরনের অবৈধ ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। পাশাপাশি দাঙ্গাবাজদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি। একই সাথে, দাঙ্গার পর দায়ের করা মামলায় কোনো নিরীহ মানুষ যেন আসামি না হয়, তা পুলিশ প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে। “অজ্ঞাতনামা” আসামির অজুহাতে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা উচিত। পর্দার আড়াল থেকে যারা দাঙ্গায় অর্থ ও অস্ত্রের জোগান দেয়, সেইসব তথাকথিত প্রভাবশালী ও সুযোগসন্ধানী মাতব্বরদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি, স্থানীয় রাজনৈতিক দল ও জনপ্রতিনিধিদের দাঙ্গাবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করে গ্রাম্য ছোটখাটো বিরোধ নিরসনে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সালিশি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বানিয়াচংয়ের সাধারণ মানুষের আকুতি রজব আলী কিংবা তাহের মিয়ার মতো আমরা আর কোনো লাশের মিছিল দেখতে চাই না, চাই না মামলার নামে হয়রানি। উপজেলার আইনশৃঙ্খলা সভাকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার খোলস থেকে বের করে এনে কার্যকর করতে হবে। কাগজের সিদ্ধান্তগুলো এবার মাঠে বাস্তবায়িত হোক, তবেই বাঁচবে বানিয়াচং, শান্তিতে ঘুমাতে পারবে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ
© All rights reserved © 2013-2026 HabiganjExpress.Com
Design and Development BY ThemesBazar.Com