রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:০৬ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
চুনারুঘাটে র‌্যাবের অভিযানে ৫২ কেজি গাঁজাসহ আটক ২ চা বাগানের শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি ‘জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ বিষয়ে হবিগঞ্জে সাংবাদিকদের সাথে জেলা জামায়াতের মতবিনিময় বানিয়াচংয়ে শিক্ষক সমিতির নির্বাচন সম্পন্ন সভাপতি আবু তাহের, সম্পাদক মোফাজ্জল নবীগঞ্জে লাইটেস স্ট্যান্ডের উদ্বোধন ও ইউএনও রুহুল আমিনকে সংবর্ধনা বনগাঁও গ্রামে সংবাদকর্মীর দোকানে হামলা-ভাংচুর ॥ হত্যার হুমকি শায়েস্তাগঞ্জে র‌্যাবের অভিযানে ১৯ কেজি গাঁজাসহ আটক ৩ হবিগঞ্জে সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন সবজির দাম বেড়েছে ॥ জনদূর্ভোগ জালালাবাদ এসোসিয়েশনের নির্বাচনে অধ্যাপক কামরুল হাসান সভাপতি ও অ্যাডভোকেট জসিম সম্পাদক নির্বাচিত নবীগঞ্জে সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ২২ জনের নাম উল্লেখ করে ৮০ জনের বিরুদ্ধে মামলা

চা বাগানের শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি

  • আপডেট টাইম রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬
  • ০ বা পড়া হয়েছে

মাধবপুর প্রতিনিধি ॥ দেশের চা শিল্পে একদিকে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে চায়ের দাম কাঙ্খিত হারে না বাড়ায় উদ্বেগে রয়েছেন বাগান মালিক ও সংশ্লিষ্টরা। ফলে দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প বর্তমানে এক ধরনের সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন চা বাগানে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, জীবনমান উন্নয়ন এবং শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন ও কর্মসূচি দেখা যাচ্ছে।
চা শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে তাদের দৈনিক মজুরির কোনো সামঞ্জস্য নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা খরচ এবং অন্যান্য জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলেও তাদের আয় সেই তুলনায় বৃদ্ধি পায়নি। ফলে পরিবার পরিচালনা করতে গিয়ে তারা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। শ্রমিক নেতাদের ভাষ্য, দেশের অর্থনীতিতে চা শিল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি শ্রমিকরা এখনও ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন চা বাগানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শ্রমিকদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে মজুরি পুনর্র্নিধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, বর্তমান মজুরি দিয়ে একটি পরিবারের নূন্যতম চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব নয়। এ কারণে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
সম্প্রতি তেলিয়াপাড়া চা বাগানে শ্রমিকরা দৈনিক ৫০০ টাকা হাজিরার দাবিতে গণবিক্ষোভ ও মিছিল করেছেন। এতে বক্তব্য দেন নারী শ্রমিক নেত্রী গীতা রানি কানু, হেমন্ত পান, বাগান সভাপতি খোকন পান তাতি এবং সাধারণ সম্পাদক লালন পাহান। একইভাবে চুনারুঘাটের আমু চা বাগানসহ আরও কয়েকটি বাগানেও ৫০০ টাকা দৈনিক মজুরির দাবিতে আন্দোলন জোরদার হচ্ছে।
শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে চা বাগানের শ্রমিক প্রতিনিধি নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। নানা অজুহাত ও জটিলতার কারণে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের মতে, প্রতিটি বাগানে নিয়মিত শ্রমিক প্রতিনিধি নির্বাচন হলে শ্রমিকদের মতামত যথাযথভাবে তুলে ধরা সম্ভব হতো এবং বাগানে আরও শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা পেত।
অন্যদিকে বাগান মালিকদের দাবি, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে চায়ের দাম প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় শিল্পটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সার, জ্বালানি, পরিবহন, শ্রম এবং অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলেও নিলাম বাজারে চায়ের মূল্য তেমন বাড়ছে না। এতে অনেক বাগান পরিচালনায় অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে চায়ের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রতিকূলতায় অনেক বাগানে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও কাঙ্খিত মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে না।
চা শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য চায়ের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। শ্রমিকদের স্বাস্থসেবা, শিক্ষা সুবিধা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের চায়ের বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
শ্রমিক সংগঠনের নেত্রী গীতা রানি কানু জানান, দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা সম্ভব। তবে দাবি উপেক্ষিত হলে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে।
মালিকপরে দাবি, চা বাগানকে কৃষি খাত হিসেবে বিশেষ সুবিধার আওতায় এনে সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ চা বাগান মারাত্মক আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাদের মতে, এক কেজি চা উৎপাদনে প্রায় ৩০০ টাকার কাছাকাছি ব্যয় হলেও অনেক ক্ষেত্রে নিলাম বাজারে লোকসান দিয়ে চা বিক্রি করতে হচ্ছে।
বৈকুণ্ঠপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক শামসুল হক ভূঁইয়া বলেন, প্রতি বছর তাদের বাগানে দুই কোটিরও বেশি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। তিনি জানান, চা শিল্পকে রায় মালিকপক্ষ সম্প্রতি সরকারের কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। সরকার এসব দাবি বিবেচনায় নিলে শিল্পটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে, অন্যথায় ধীরে ধীরে অনেক বাগান বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ঐতিহ্যবাহী চা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে শ্রমিক ও মালিক-উভয় পরে স্বার্থ বিবেচনায় ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ন্যায্য মজুরি, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সহজ ঋণ সুবিধা এবং চায়ের বাজারমূল্য বৃদ্ধি নিশ্চিত করা গেলে শিল্পটি আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে। বর্তমানে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি এবং চায়ের স্থবির বাজারমূল্যের বাস্তবতার মাঝেই দেশের চা শিল্প টিকে থাকার পথ খুঁজছে।

 

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2013-2021 HabiganjExpress.Com
Design and Development BY ThemesBazar.Com