স্টাফ রিপোর্টা ॥ মঙ্গলবার হবিগঞ্জ শহরের থানা এলাকায় এনসিপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মাঝে সংঘর্ষের ঘটনায় হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদল সভাপতি শাহ রাজিব আহমেদ রিংগনসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে ১০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বুধবার রাত ৯টার দিকে এনসিপি’র ছাত্র সংগঠন জেলা ছাত্র শক্তির আহ্বায়ক তন্ময় তাহের রুবেল বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। পুলিশ সুপার মো. তারেক মাহমুদ তাদের কাছ থেকে মামলাটি গ্রহণ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি, দক্ষিনাঞ্চল মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি, উত্তরাাঞ্চল মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী ও মাহমুদা মিতু এমপি।
মামলার অপর অভিযুক্তরা হচ্ছেন, বৃন্দাবন কলেজ ছাত্রদল সেক্রেটারী আশরাফুজ্জামান রিয়াজ, জেলা ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম ইমন, ছাত্রদল নেতা মুজাক্কির হোসেন ইমন, এমএইচ শিমুল, আল সাইমন, মাহফুজ চৌধুরী, ইসকিয়াক রহমান ইসতি, শেখ সাব্বির, নাজমুল হোসেন অনি, ও রক্সি ইসলাম।
অভিযোগে বলা হয়, হবিগঞ্জে পদযাত্রা শেষে মৌলভী বাজার যাবার পথে এনসিপি উত্তরাাঞ্চল মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীসহ নেতৃবৃন্দ রওয়ানা দেন। এ সময় ছাত্রদল ও যুবদল এনসিপি জেলা সদস্য সচিব মাহবুবুল বারী চৌধুরী মুবিনসহ নেতাকর্মীদের উপর হামলা চালায়। এতে এনসিপি নেতা সারজিস আলম, ছাত্রশক্তির আলীফসহ ২০ জন নেতাকর্মী আহত হন। জেলা সদস্য সচিব মাহবুবুল বারী চৌধুরী মুবিন হাত ভেঙ্গে যায়। আহতদের হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানেও হামলা করা হয়। হামলাকারীরা ভাংচুর করে গাড়ির ২০ লাখ টাকার যন্ত্রপাতির ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। গাড়িতে থাকা নগদ ৫ লাক টাকা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।
আরজিতে বাদীর দাবী ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের গ্রেফতার ও উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, আলীফের চোখের চিকিৎসাসহ সকল আহতদের চিকিৎসা খরচ সরকারকে বহন এবং এনসিপি হবিগঞ্জের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার দিনব্যাপী আজমিরীগঞ্জ ও জেলা শহরে এনসিপির কর্মসূচি ছিল। এতে এনসিপির নেতা নাসির উদ্দিন পাটোয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ¦ জি কে গউছ এমপিসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের কটাক্ষ করে বক্তব্য দেন। সন্ধ্যায় জেলা শহরের সমাবেশ শেষ করে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী ও সারজিস আলম সার্কিট হাউজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। কোর্ট মসজিদ এলাকায় পৌছুলে তাদের গাড়ি বহরে একদল যুবক হামলা করে। এ সময় গাড়ি ব্যাপক ভাঙ্গচুর করা হয়। এক পর্যায়ে সারজিস আলমসহ নেতাকর্মীরা সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখায় গিয়ে আশ্রয় নেন। তখন দুইপক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়।
সারজিস আলম এ সময় অভিযোগ করে বলেন, ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তাদের উপর হামলা করেছে। এতে তিনিসহ তাদের অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী আহত হন। এ ঘটনায় রাতে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারি ও সারজিস আলম রাত ১১টার দিকে মৌলভীবাজার যান। সেখান থেকে রাতে হবিগঞ্জে বুধবার বিক্ষোভ সমাবেশ করার ঘোষণা দেন। একই সাথে জেলা ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলও পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এ অবস্থায় জেলা প্রশাসন বুধবার সকালে হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এতে ৫ জনের বেশি মানুষকে এক সাথে জড়ো হওয়ার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
এদিকে মৌলভীবাজারে দলীয় কর্মসূচি শেষে বুধবার বিকেলে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, দক্ষিনাঞ্চল মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি, নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী বুধবার বিকেলে মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তারা প্রথম দফায় শ্রীমঙ্গলের মুছাই এলাকায় পৌছুলে পুলিশ তাদের গাড়িবহর আটকে দেয়। পরে দীর্ঘক্ষণ বাকবিতন্ডার পর তারা সেখান থেকে অতিক্রম করেন। এরপরই তাদেরকে বাহুবল উপজেলার রশিদপুর এলাকায় আবারও আটকে দেয়া হয়। তখন ফের তাদের সাথে পুলিশের বাকবিতন্ডা হয়। এ সময় তাদেরকে মৌলভীবাজারে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু এনসিপি নেতারা তাতে কোনভাবেই সায় দেন নি। তারা হবিগঞ্জে পৌছানোর দাবিতে অনঢ় ছিলেন। এক পর্যায়ে পুলিশ সুপার মো. তারেক মাহমুদ বিষয়টি হস্তক্ষেপ করেন। পরে দীর্ঘ আলোচনার পর তারা কামাইছড়া ফাঁড়িতে মামলা করতে রাজি হন। এরপর তাদের একটি প্রতিনিধি দল সেখানে যায়।
উল্লেখ্য, গতকাল মঙ্গলবার হবিগঞ্জ শহরের সাইফুর রহমান টাউন হলের সামনে জুলাই পদযাত্রার সভা শেষ করে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা গাড়ি বহর নিয়ে সার্কিট হাউজে যাবার পথে কোর্ট মসজিদ এলাকায় পৌঁছলে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, সারজিস আলমের উপর হামলা চালায় একদল যুবক। এ সময় তাদের বহণকারী গাড়ি ভাংচুর করা হয়। এক পর্যায়ে তারা সোনালী ব্যাংক প্রধান শাখার ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নেন। তখন দুইপক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে সারজিস আলমসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। পরে পুলিশ গিয়ে রাত ৮টার দিকে তাদেরকে উদ্ধার করে সার্কিট হাউজে নিয়ে যায়। রাত ১১টায় সারজিস আলম মৌলভীবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। এর আগে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে রাতেই ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং এনসিপি পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর প্রেক্ষিতে বুধবার সকালে জেলা প্রশাসন হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এ নিয়ে গতকাল দিনভর শহরে উত্তেজনা বিরাজ করে। পুলিশ বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেয়। পাশাপাশি র্যাব শহরে টহল দেয়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
এদিকে মামলার প্রতিক্রিয়ায় হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজিব আহমেদ রিংগন বলেন, জুলাই আন্দোলন সহ বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ও অসংখ্য মামলার প্রধান আসামী হয়েছি। আর গতকালের ঘটনায় যেখানে আমি বা আমার সংগঠন জড়িত না সেখানেই আমাকে প্রধান আসামী করা হয়েছে যা নিন্দনীয়। আমি এর তীব্র নিন্দা ও ঘৃনা জানাই। পাশাপাশি এটাই বলতে চাই এনসিপির নেতৃবৃন্দ আর শেখ হাসিনার সরকারের মধ্যে আর কোন তফাত রইল না।