মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩১ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম
ইতালী যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ১২ দিন ধরে ৭৩ বাংলাদেশি নিখোঁজ ॥ হবিগঞ্জের ১০ জন ॥ এক বছরে হবিগঞ্জের ৩৮ জন নিখোঁজ ১০ ফুট দূরত্বে মসজিদ-মন্দির সম্প্রীতির অনন্য নজির বাহুবলে ॥ এক পাশে আজান, অপর পাশে উলুধ্বনি বানিজ্য সচিব হলেন হবিগঞ্জের কৃতি সন্তান শরফ উদ্দীন আহম্মেদ চৌধুরী ইকবাল মাধবপুরে দূর্গা পূজা মন্ডপ পরিদর্শন করেছেন এমপি সৈয়দ মোঃ ফয়সল উমেদনগরে টমটমে বসা নিয়ে সংঘর্ষে আহত ৫০ বাহুবলে ৪০ লাখ টাকার মালামালসহ কাভার্ডভ্যান ছিনতাই ঘটনায় গ্রেপ্তার ৪ লাখাইয়ে পুলিশের অভিযান ৩৮ পিস ইয়াবাসহ আটক ২ জয়ন্তিকা ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন লাখাইয়ে ফ্যামিলি কার্ড ও খানা তথ্যভাণ্ডার জরিপ কর্মসূচির উদ্বোধন নবীগঞ্জে অভিযানের পরও তীব্র যানজট ॥ অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারি

ইতালী যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ১২ দিন ধরে ৭৩ বাংলাদেশি নিখোঁজ ॥ হবিগঞ্জের ১০ জন ॥ এক বছরে হবিগঞ্জের ৩৮ জন নিখোঁজ

  • আপডেট সময় সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪৬ বার পড়া হয়েছে

এসএম সুরুজ আলী ॥ অবৈধ পথে লিবিয়া হয়ে সমুদ্র ইতালী, গ্রীসসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেতে গিয়ে গত ১ বছরে হবিগঞ্জের ৩৮জন নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যুর বিষয়টি পরিবার নিশ্চিত হয়েছেন। আবার অনেকেই লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের জিম্মিশালায় বন্দি হয়ে বাড়ি-ভিটা হারিয়ে সর্বশান্ত হয়েছেন। ঋণগ্রস্ত হয়ে ইউরোপে উদ্দেশ্যে যাওয়া অনেক যুবকদের পরিবারকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আত্মগোপনে থাকতে হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত যুবকদের পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রথমে তারা দালালদের লিবিয়ার সমুদ্র হয়ে ইতালীতে যাওয়ার জন্য ১৯/২২ লাখ টাকায় চুক্তিবদ্ধ হন। আর যারা গ্রীসে যেতে চান, তারা দালালদের সাথে ১৩/১৪ লাখ টাকায় চুক্তিবদ্ধ হন। চুক্তি অনুযায়ী ১ম ধাপে দালালরা ৪/৫ লাখ টাকা যুবকদের পরিবারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন। পরবর্তীতে লিবিয়া নিয়ে গেইম দেওয়া অর্থাৎ ইতালী অথবা গ্রীসে পাঠানো কথা বলে চুক্তিকৃত টাকাগুলো নিয়ে নেন। পরবর্তীতে গেইম দেই দিচ্ছি বলে যুবকদের গেইম ঘর নামে বন্দিশালায় মাসের পর মাস আটক রাখেন। এর মধ্যে অনেক যুবকদের গেইম দেওয়ার কথা বলে সমুদ্র নিয়ে মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেন দালালরা। মাফিয়ায় আটক করার পর প্রত্যেক যুবকদের কাছ থেকে আরো ৮/১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। দাবিকৃত টাকা না দিলে যুবকদেরকে বেধড়ক মারপিট করেন মাফিয়া চক্র। এমনকি মারধোরের করুন দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে বন্দি যুবকদের পরিবারের কাছে পাঠানো হয়। এসব যুবকদের পরিবারের সদস্যরা ভিডিও চিত্র দেখে নিজের সন্তাদের বাঁচানোর জন্য নিজের জমি-জমা, ঘর-বাড়ি বিক্রি করে মাফিয়াদের টাকা দিচ্ছেন। যারা দাবিকৃত টাকা দিচ্ছেন মাফিয়ারা তাদেরকে ছেড়ে দিচ্ছেন। আর যারা টাকা দেয়নি তাদেরকে আটক করে দিনের পর পর দিন নির্যাতন করা হচ্ছে। অনেক যুবকরা ২/৩ বার মাফিয়ার কাছে বন্দি হচ্ছেন। এ অবস্থায় অনেক যুবকরা ৪০/৫০ লাখ টাকা খরচ করে গ্রীস অথবা ইতালিতে পৌছতে পারছেন। আবার অনেকেই ৪০/৫০ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাড়িতে ফিরতে হচ্ছে। আবার সমুদ্র পথে পাড়ি দিয়ে টলার বা বোর্ড ডুবে অনেকের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। এসব মৃত্যু ব্যক্তিদের লাশ সমুদ্র দিয়ে ভাসিয়ে দেওয়ার কারণে তাদের কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক মাস পূর্বে হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের চানপাড়ার কৃষক তোফাজ্জল মিয়ার ছেলে মোফাজ্জল মিয়া লিবিয়া হয়ে ইতালীতে যাওয়ার জন্য ১০ লাখ টাকায় দালালের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। চুক্তি অনুযায়ী ১ম ধাপে অর্ধেক টাকা দিয়ে সৌদি আরব পাঠায় দালাল। সৌদি আরবে কয়েকদিন রাখার পর তাকে মিশর হয়ে লিবিয়াতে নিয়ে যায় দালাল। সেখানে নেওয়ার পর তাকে কবজায় নিয়ে ধাপে ধাপে ২৩ লাখ টাকা আদায় করে দালাল। ১২ দিন পূর্বে লিবিয়া থেকে সমুদ্র পথে ইতালীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন মোফাজ্জল। তার সঙ্গে ছিলেন আরও ৭২ বাংলাদেশি। এর মধ্যে ১০জন ছিলেন হবিগঞ্জের। তাদের সর্বশেষ তথ্য অজানা। পরিবারের সদস্যরা জানালেন, মোফাজ্জলকে প্রথমে ১০ লাখ টাকায় লিবিয়া নিয়ে যায় দালাল। সেখানে তাকে তুলে দেওয়া হয় মাফিয়া চক্রের হাতে। সেই চক্র ইতালী নেওয়ার জন্য দফায় দফায় নির্যাতন করে আরও ১৩ লাখ টাকা আদায় করে। এভাবে ৮ মাসে সব মিলিয়ে হাতিয়ে নেয় ২৩ লাখ টাকা। গত ৬ অক্টোবর এই যুবকের সঙ্গে আরও ৭২ বাংলাদেশিকে তুলে দেওয়া হয় একটি রাবারের নৌকায়। গন্তব্য ইতালি। ওই সময় বাড়িতে শেষ কথা হয়েছিল মোফাজ্জলের। মোফাজ্জলের মা ফাতেমা বেগম জানান, ‘ছেলেকে ইউরোপ পাঠানোর জন্য কোনো টাকা ছিল না। তাই সংসারে স্বচ্ছলতা আনার আশায় বিক্রি করা হয় শেষ সম্বল বাড়ি ও বসতি জমি। এতে না হওয়ায় ঋণ নেওয়া হয় উচ্চসুদে। প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা কিস্তি। এর সঙ্গে আরও ৫ ছেলে মেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে মানবেতর দিন কাটছে, অনেক দিন অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হয়।’ ভুক্তভোগীর বাবা তোফাজ্জল মিয়া বললেন, ‘দালাল চক্র প্রথম দুদিন বলেছে, আমার ছেলে সাগরে নৌবাহিনীর জাহাজে আটকা পড়েছে। এখন আর ফোন ধরে না। এত টাকা দিয়েও ছেলেটার কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। এখন আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব, কে আমাদের রুটি রুজির ব্যবস্থা করবে ?’ ইতালীর উদ্দেশ্যে নৌকায় ওঠার আগে মানব পাচারকারী চক্রের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ব্যবহার করে মামা ও বাবার সঙ্গে কথা হয়েছিল মোফাজ্জলের। তিনি জানিয়েছিলেন, একটি নৌযানে দুই গ্রুপে ৭৩ বাংলাদেশি উঠেছেন। কোনো বিপদ না হলে দুই দিনের মধ্যে ইতালি পৌঁছে বাড়িতে যোগাযোগ করবেন। সেটিই ছিল তার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের শেষ কথা। হবিগঞ্জের অন্তত ১০ জনসহ ৭৩ বাংলাদেশি নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে ৫ দিন পর থেকে ইতালীতে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ শুরু করেন আবুল কাশেম। গত বছর একই পথে ইতালি গিয়েছিলেন তিনি। দূতাবাস থেকে তাকে জানানো হয়েছে, সম্প্রতি ৭৩ জনের কোনো দল ইতালিতে পৌঁছায়নি। অভিবাসন প্রত্যাশীদের ক্যাম্পেও মোফাজ্জলের খোঁজ পাননি কাশেম। এর আগে গত ১ বছরে হবিগঞ্জের আরো ২৮জন যুবক নিখোঁজ হয়েছেন। এর পরিবার এখনো তাদের কোন সন্ধান পাচ্ছেন না। এর মধ্যে গত এপ্রিল মাসে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সানাবই গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে লুৎফুর রহমান ও লাখাই উপজেলার সিংহ গ্রামের বাসিন্দা জুনাইদ মিয়া লিবিয়া থেকে গ্রীসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকায় অসুস্থ হয়ে মারা যান। তাদের সাথে আরো ২০জন মারা যান। এর মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশী ছিলেন। লুৎফুর রহমান ও জুনাইদ মিয়ার পরিবারের সদস্যরা জানান, সদর উপজেলার রিচি গ্রামের দালাল আব্দুস সালামের মাধ্যমে জনপ্রতি ২২ লাখ টাকা চুক্তিতে গত ডিসেম্বরে ইতালী যাওয়ার উদ্দেশ্যে তারা লিবিয়ায় যান। প্রায় সাড়ে ৩ মাস সেখানে থাকার পর ২১ মার্চ পরিবারের সদস্যদের ফোন করে জানান, সেদিনই তারা নৌকায় করে গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
এ ব্যাপারে হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ (প্রশাসন ও অর্থ) মোঃ রাশেদুল হক চৌধুরী জানান, অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার উদ্দেশ্যে লিবিয়া গিয়ে যেসব যুবকরা নিখোঁজ হচ্ছেন তাদের পরিবারের কেউ পুলিশের কাছে অভিযোগ দিচ্ছেন না। যারা অভিযোগ দিচ্ছেন পুলিশ পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ
© All rights reserved © 2013-2026 HabiganjExpress.Com
Design and Development BY ThemesBazar.Com