রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৪ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম
সমুদ্র পথে ইতালী যাওয়ার পথে হবিগঞ্জের ১২ যুবক নিখোঁজ মাধবপুরে অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি নবীগঞ্জ থানা হাজতে “জয় বাংলা স্লোগান” দায়িত্বে অবহেলায় পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার হবিগঞ্জ সদর থানা পুলিশের অভিযানে ৭ আসামি গ্রেপ্তার নবীগঞ্জে সিদুর খেলা ও দেবী বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব শায়েস্তাগঞ্জে রেললাইনে ফাটল ধীরগতিতে ট্রেন চলাচলের নির্দেশ চুনারুঘাটে বিজিবির পৃথক অভিযান ৪৮ কেজি গাঁজাসহ যুবক আটক মাধবপুরে শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপ্তি পুরস্কার বিতরণ ও প্রতিমা বিসর্জন লাখাইয়ে সাপের কামড়ে যুবকের মৃত্যু শায়েস্তাগঞ্জে স্কুল ছাত্রীর ছবি-ভিডিও ধারণ করে হুমকি ॥ যুবক আটক

সমুদ্র পথে ইতালী যাওয়ার পথে হবিগঞ্জের ১২ যুবক নিখোঁজ

  • আপডেট সময় শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪৩ বার পড়া হয়েছে

এস এম সুরুজ আলী ॥

বানিয়াচং উপজেলার মক্রমপুর গ্রামের গরুর ব্যবসায়ী জাসদ মিয়া স্ত্রী, ৪ পুত্র ৪ কন্যা নিয়ে অনেকটা সুখে দিন কাটাচ্ছিলেন। এর মধ্যে ২ ছেলে সৌদি আরব রয়েছেন। জাসদ মিয়ার ৩য় পুত্র রবিন মিয়ার স্থানীয় হাইস্কুলে ৭ম শ্রেণী থেকে ৮ম শ্রেণীতে উঠার কথা ছিল। এর মধ্যে জাসদ মিয়া পরিকল্পনা করেন রবিনকে ইউরোপে পাঠাবেন। যে পরিকল্পনা, সেই ব্যবস্থা অনুযায়ী ১৫ বছর বয়সী রবিনের বয়স বাড়িয়ে জন্মনিবন্ধন ও এনআইডি তৈরী করা হয়। পরবর্তীতে পাসপোর্ট তৈরী করে মাধবপুরের দালাল জাহাঙ্গীরের সাথে ১৪ লাখ টাকায় গ্রীসে পাঠানোর চুক্তিবদ্ধ হন জাসদ মিয়া। দালালের সাথে চুক্তির পর রবিনকে কয়েক মাস পূর্বে সৌদি আরব হয়ে লিবিয়াতে পাঠানো হয়। লিবিয়া থেকে গত ১৭ জুলাই রবিনসহ ৬১ জনকে গ্রীসের উদ্দেশ্যে গেইম বা প্লাস্টিকের বোর্ডে পাঠানো হয়েছে বলে জানানো হয়। এরপর থেকে অদ্যবর্তী পর্যন্ত রবিনের সন্ধান পাচ্ছেন না তার পরিবার। শুধু রবিনই নয়, ওই বোর্ডে একই গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের ছেলে রিমন মিয়া, ফারুক মিয়া ছেলে মহামিন মিয়াসহ হবিগঞ্জের আরো ১২ জন ছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন লাখাইয়ের মনতৈল গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে সামির বাদশা, বানাকান্দির নয়ন মিয়া, বেগুনাই গ্রামেরর মাহিন মাসুম, মাধবপুররের হাতুরাকান্দি গ্রামের আব্দুল হামিদ, হবিগঞ্জ সদর উপজেলার জয়নগর গ্রামের শরীফ আহমেদ, সানি মিয়া, সামছুর রহমান, জালালাবাদের নাজমুল মিয়া, বামকান্দির সাদিকুর রহমান শিবলু। নিখোঁজ রবিনের চাচা বিলাল মিয়া জানান, তার ভাতিজা রবিন প্রায় ৩ মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। ৩ মাস ধরে তার কোন সন্ধান পাচ্ছেন না তারা। দালালকে ফোন করে পাওয়া যাচ্ছে না। সন্তানের সন্ধান না পেয়ে তার মা-বাবা এখন পাগলের প্রলাপ করছেন।
তিনি আরো জানান, রবিনকে গ্রীসে পৌছে দেওয়া পর্যন্ত দালালের সাথে ১৪ লাখ টাকা চুক্তি ছিল। চুক্তি অনুযায়ী ৮ লাখ টাকা তারা তাকে দেন। বাকি ৬ লাখ টাকা গ্রীসে পৌছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল। ১৭ আগস্ট রবিনসহ ৬১ জনকে গেইম দিয়েছেন বলে দালাল পরিবারকে জানান। এরপর থেকে রবিনসহ তার সাথের কারো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এখন দালালকে ফোন দিলেও ফোন রিসিভ করছেন না। রবিনের যে ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে তার অধিকাংশ টাকাই ঋণের উপর আনা হয়েছে। এ দিকে সন্তান নিখোঁজ অন্য দিকে ঋণ পরিশোধ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন রবিনের বাবা জাসদ মিয়া। বিলাল মিয়া তার ভাতিজা রবিনসহ অন্যান্য নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান পেতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করছেন। নিখোঁজ মুহামিন এর বাবা ফারুক মিয়া জানান, কুরবাণীর ঈদের পর মুহামিন বাবা থেকে লিবিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। লিবিয়া থেকে ১৭ জুলাই গ্রীসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে তারা নিখোঁজ হন। এর পর থেকে তাদের আর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। দালালকে এখন ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। যারা সহকারি দালাল রয়েছে তাদের সাথে যোগাযোগ করা তারা বলেন লিবিয়া ও মিশরের মধ্য স্থানে একটি জেলাখানায় তারা বন্ধি রয়েছেন। এ অবস্থায় আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছি। এর আগে অবৈধ পথে লিবিয়া হয়ে সমুদ্র পথে ইতালী, গ্রীসসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশে যেতে গিয়ে গত ১ বছরে হবিগঞ্জের ৩৮জন নিখোঁজ হয়েছেন। গত ৬ অক্টোবর হবিগঞ্জের ১০ জনসহ আরো ৭২ জন বাংলাদেশী নিখোঁজ হন। এ নিয়ে এক বছরে হবিগঞ্জে ৬০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে আরেকটি সূত্র জানিয়েছেন ৬০ জন নয়, শতাধিকের উপরে হবিগঞ্জের নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যুর বিষয়টি পরিবার নিশ্চিত হয়েছেন। লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের জিম্মিশালায় বন্দি হয়ে অনেকেই বাড়ি-ভিটা হারিয়ে সর্বশান্ত্র হয়েছেন। ঋণগ্রস্ত হয়ে ইউরোপে উদ্দেশ্যে যাওয়া অনেক যুবকদের পরিবারকে এলাকা ছেড়ে অন্য স্থানে গিয়ে আত্মগোপনে থাকতে হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত যুবকদের পরিবারের সাথে কথা বলে জানাগেছে, প্রথমে তারা দালালদের লিবিয়ার সমুদ্র হয়ে ইতালীতে যাওয়ার জন্য ১৮/১৯ লাখ টাকায় চুক্তিবদ্ধ হন। আর যারা গ্রীসে যেতে চান, তারা দালালদের সাথে ১৩/১৪ লাখ টাকায় চুক্তিবদ্ধ হন। চুক্তি অনুযায়ী ১ম ধাপে দালালরা ৪/৫ লাখ টাকা যুবকদের পরিবারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন। পরবর্তীতে লিবিয়া নিয়ে গেইম দেওয়া অথাৎ ইতালী অথবা গ্রীসে পাঠানো কথা বলে চুক্তিকৃত টাকাগুলো নিয়ে নেন। পরবর্তীতে গেইম দেই দিচ্ছি বলে যুবকদের গেইম ঘর নামে বন্দিশালায় মাসের পর মাস আটক রাখেন। এর মধ্যে অনেক যুবকদের গেইম দেওয়ার কথা বলে সমুদ্র নিয়ে মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেন দালালরা। মাফিয়ায় আটক করার পর প্রত্যেক যুবকদের কাছ থেকে আরো ৮/১০ লাখ টাকা আদায় করেন। দাবিকৃত টাকা না দিলে যুবকদেরকে বেধড় মারপিট করেন মাফিয়া চক্র। এমনকি মারধোরের করুন দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে বন্দি যুবকদের পরিবারের কাছে পাঠানো হয়। এসব যুবকদের পরিবারের সদস্যরা ভিডিও চিত্র দেখে নিজের সন্তাদের বাঁচানোর জন্য নিজের জমি-জমা, ঘর-বাড়ি বিক্রি করে মাফিয়াদের টাকা দিচ্ছেন। যারা দাবিকৃত টাকা দিচ্ছেন মাফিয়ারা তাদেরকে ছেড়ে দিচ্ছেন। আর যারা টাকা দেয়নি তাদেরকে আটক করে দিনের পর পর দিন নির্যাতন করা হচ্ছে। অনেক যুবকরা ২/৩ বার মাফিয়ার কাছে বন্দি হচ্ছেন। এ অবস্থায় অনেক যুবকরা ৪০/৫০ লাখ টাকা খরচ করে গ্রীস অথবা ইতালিতে পৌছতে পারছেন। আবার অনেকেই ৪০/৫০ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাড়িতে ফিরতে হচ্ছে। আবার সমুদ্র পথে পাড়ি দিয়ে টলার বা বোর্ড ডুবে অনেকের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। এসব মৃত্যু ব্যক্তিদের লাশ সমুদ্র দিয়ে ভাসিয়ে দেওয়ার কারণে তাদের কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। গত এপ্রিল মাসে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সানাবই গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে লুৎফুর রহমান ও লাখাই উপজেলার সিংহগ্রামের বাসিন্দা জুনাইদ মিয়া লিবিয়া থেকে গ্রীসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকায় অসুস্থ হয়ে মারা যান। তাদের সাথে আরো ২০ জন মারা যান। এর মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশী ছিলেন। লুৎফুর রহমান ও জুনাইদ মিয়ার পরিবারের সদস্যরা জানান, সদর উপজেলার রিচি গ্রামের দালাল আব্দুস সালামের মাধ্যমে জনপ্রতি ২০ লাখ টাকা চুক্তিতে গত ডিসেম্বরে ইতালী যাওয়ার উদ্দেশে লিবিয়ায় যান তারা। প্রায় সাড়ে তিন মাস সেখানে থাকার পর ২১ মার্চ পরিবারের সদস্যদের ফোন করে জানান, সেদিনই তারা নৌকায় করে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেন।
এ ব্যাপারে বানিয়াচং থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ নামজুল হক জানান, অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার উদ্দেশ্যে লিবিয়া গিয়ে আমার থানার যেসব যুবকরা নিখোঁজ হয়েছেন তাদের পরিবার থানায় অভিযোগ দিচ্ছেন না। অভিযোগ দিলে আমরা বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

 

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ
© All rights reserved © 2013-2026 HabiganjExpress.Com
Design and Development BY ThemesBazar.Com