স্টাফ রিপোর্টার ॥ হবিগঞ্জ শহরে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত নিয়ে ‘কিশোর গ্যাংদের উৎপাতে শহরবাসী আতঙ্কিত’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছে সদর থানা পুলিশ। শহরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধপ্রবণ কিশোরদের আইনের আওতায় আনতে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ১১ জনকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল রবিবার (১১ অক্টোবর) বিকাল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত টানা চার ঘণ্টা শহরের বিভিন্ন এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
এদিকে, পুলিশের অভিযানে আটক কিশোরদের ছাড়িয়ে নিতে সদর থানায় এক শ্রেণির নেতাকর্মীর তদবির শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে থানায় গিয়ে দেখা যায়, আটক কিশোরদের ছাড়িয়ে নিতে প্রায় শতাধিক লোক ভিড় করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিভিন্নভাবে তদবির করে আটক ব্যক্তিদের মুক্ত করার চেষ্টা চালান। এ নিয়ে থানা এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। তবে অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গতকাল রবিবার বিকাল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত হবিগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহিদুল হকের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে এসআই ধ্রুবেশ চক্রবর্তী, এসআই প্রদীপ রায়সহ সদর থানা পুলিশের একটি দল অংশ নেয়। অভিযানের অংশ হিসেবে শহরের শায়েস্তানগর, ২ নম্বর পুল, উমেদনগর, সিনেমা হল এলাকা, তিনকোনা পুকুরপাড়, চৌধুরী বাজার, নোয়াবাদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অভিযান চালানো হয়।
অভিযান চলাকালে জয়, শ্রাবণ, শুভ, অনিক, রুমেলসহ মোট ১১ জনকে আটক করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে এমন কয়েকজন রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে আগেও মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, পূর্বের মামলার তথ্য এবং অন্যান্য বিষয় যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ শহরে বিভিন্ন নামে কয়েকটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে জেক্সার, এক্সার, জেকু, নাইন এক্সার ও পাংকু নামের পাঁচটি গ্রুপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চলাফেরা, এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে। তাদের তৎপরতায় শহরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের একটি অংশ বিভিন্ন এলাকায় দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে। নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধে জড়িয়ে পড়া, সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। ফলে শহরের শান্তিপ্রিয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের দলবদ্ধ উপস্থিতি ও বেপরোয়া আচরণ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে।
সচেতন মহলের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, পাশাপাশি এসব গ্রুপের পেছনে কারা ইন্ধন দিচ্ছে, তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কারও সহযোগিতা রয়েছে কি না এবং তারা কীভাবে সংঘবদ্ধ হচ্ছে, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধান, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক নজরদারি জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
এ বিষয়ে হবিগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহিদুল হক জানান, আটক ব্যক্তিদের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংশ্লিষ্টতা ও মামলার তথ্য পাওয়া যাবে, তাদের বিষয়ে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পুলিশের এ অভিযানকে শহরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। তবে অভিযান-পরবর্তী সময়ে এসব গ্রুপের কার্যক্রম কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। শহরবাসীর প্রত্যাশা, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যাতে হবিগঞ্জ শহরে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং জনমনে স্বস্তি ফিরে আসে।