স্টাফ রিপোর্টার ॥ হবিগঞ্জের খোয়াই ও সুতাং নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি শক্তিশালী চক্র প্রশাসনের অভিযান ও জরিমানাকে উপেক্ষা করে ড্রেজার মেশিনের সাহায্যে দিনের দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে। নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে উত্তোলিত বালু বিক্রি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি স্থানীয়দের। এভাবে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে নদীর তীর, বাঁধ, কৃষি জমি ও আশপাশের জনবসতি হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হবিগঞ্জ শহরতলীর কামড়াপুর, নসতরপুর, তিতখাই, জালালাবাদ, রামপুর, মাছুলিয়া, তেঘরিয়া, রাঙ্গেরগাঁও ও মশাজানসহ বিভিন্ন এলাকায় খোয়াই নদী থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে শায়েস্তাগঞ্জের আলাপুর ও সুতাং নদীর বিভিন্ন স্থানে এবং চুনারুঘাট উপজেলার বদরগাজি, আব্দুল্লাহপুরসহ আশপাশের এলাকায় বালু উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা নদীর বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার মেশিন স্থাপন করে বালু সংগ্রহ করছেন। দুপুর ১২টা থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত কোনো কোনো স্থানে এ কার্যক্রম চলে বলে স্থানীয়দের দাবি। উত্তোলিত বালু বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে অন্যত্র সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নদীর তীরবর্তী এলাকার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের অভিযান ও জরিমানার ব্যবস্থা থাকলেও তা স্থায়ী ফল দিচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাঁদের ভাষ্য, প্রশাসন কোনো কোনো স্থানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেও এক-দুই দিনের মধ্যে আবারও বালু উত্তোলন শুরু হয়। কখনো আগের স্থানেই, আবার কখনো নদীর অন্য অংশে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, অভিযান চালিয়ে জরিমানা করার পরও যদি একই কার্যক্রম আবার শুরু হয়, তাহলে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়? বারবার একই ধরনের অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে স্থায়ী নজরদারি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কেন-এ নিয়েও তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, যেসব স্থানে বারবার বালু উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেসব স্থান চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বালু উত্তোলনের বৈধ অনুমোদন রয়েছে কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
খোয়াই ও সুতাং নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসতবাড়ি, কৃষিজমি, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। এসব নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হলে নদীর তলদেশের গঠন ও পানিপ্রবাহে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে নদীর তীর কিংবা বাঁধের কাছাকাছি স্থান থেকে বালু তোলা হলে মাটি এবং তীরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে নদীর বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে ঝুঁকিপূর্ণ তীর ও বাঁধের পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে নদীসংলগ্ন এলাকার মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে কোন কোন স্থানে বালু উত্তোলনের কারণে ইতোমধ্যে নদীর তীর বা বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিন পরিদর্শন ও কারিগরি মূল্যায়ন প্রয়োজন।
নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন শুধু বাঁধের জন্যই নয়, পরিবেশের জন্যও উদ্বেগের কারণ। অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তিত হতে পারে। পাশাপাশি জলজ প্রাণীর আবাসস্থল, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ এবং নদীনির্ভর জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নদীকে ঘিরে যেসব পরিবার কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও অন্যান্য জীবিকার সঙ্গে যুক্ত, তারাও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। তাই বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব ও নদীর ধারণ ক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর বিভিন্ন স্থানে বালু উত্তোলন ও পরিবহনের সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। তবে এই চক্রে কারা রয়েছেন, কোথায় কোথায় বালু উত্তোলনের বৈধ অনুমোদন রয়েছে এবং উত্তোলিত বালু কোথায় সরবরাহ করা হচ্ছে-এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট স্থানগুলো পরিদর্শন, ইজারা ও অনুমোদনসংক্রান্ত নথি যাচাই এবং আইন লড়ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর মতে, শুধু মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা ও জরিমানা করে অবৈধ বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এজন্য নিয়মিত তদারকি, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, অবৈধ ড্রেজার ব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং বালু পরিবহনের বৈধতা যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নদীর বাঁধ ও তীরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা গেলে নদী রা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
খোয়াই ও সুতাং নদীকে ঘিরে উঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা। নদী রক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নদীতীরবর্তী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সম্পাদনা-সংক্রান্ত পরামর্শ: প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বক্তব্য এবং সাম্প্রতিক অভিযান-জরিমানার তথ্য সংগ্রহ করে যুক্ত করলে সংবাদটি আরও তথ্যসমৃদ্ধ ও নিরপেক্ষ হবে।