স্টাফ রিপোর্টার ॥ এক সময় গ্রাম কিংবা শহর ভাগাড়ে তাকালেই দেখা মিলত শকুনের। কোনো মৃত প্রাণীর সন্ধান পেলেই আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসত ‘প্রকৃতির ঝাড়ুদার’ খ্যাত এই পাখি। মৃত প্রাণীর দেহাবশেষ খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি রোগজীবাণুর বিস্তার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে শকুন। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। দিন দিন কমছে শকুনের সংখ্যা। এক সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবাধ বিচরণ করা এই পাখি এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে শুধু হবিগঞ্জেই শকুনের সংখ্যা কমে প্রায় অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে সারাদেশে শকুনের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০০টি। এর মধ্যে হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বনাঞ্চলেই ছিল শতাধিক শকুন। বর্তমানে সরকারি হিসাব অনুযায়ী সেখানে প্রায় ৬০টি শকুন রয়েছে। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা ৪০-৫০টির বেশি নয় বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। শকুন কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে প্রাণীর শরীরে বিষাক্ত ওষুধ প্রয়োগকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে গবাদিপশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার পর সেই পশুর মৃতদেহ শকুনের খাদ্যে পরিণত হলে বিষক্রিয়ায় পাখিগুলোর মৃত্যু হচ্ছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় শকুনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৃত প্রাণীর দেহ দ্রুত খেয়ে ফেলার মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি বিভিন্ন রোগের জীবাণু ছড়িয়ে পড়া রোধ করে এই পাখি। ফলে শকুনের সংখ্যা কমে যাওয়াকে শুধু একটি প্রাণীর অস্তিত্ব সংকট নয়, পরিবেশের জন্যও সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। শকুন সংরক্ষণে কাজ করছে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)। সংগঠনটির প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট সুলতান আহমেদ শকুনের ‘ফিল্ড অ্যাক্টিভিটি’ দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন। তার নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল মাঠপর্যায়ে কাজ করছে।
সুলতান আহমেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের দুটি এলাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শকুন রয়েছে। এর মধ্যে সুন্দরবন এলাকায় প্রায় ২০০টি এবং হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বনাঞ্চলে প্রায় ৫০টি শকুন রয়েছে। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগেও রেমা-কালেঙ্গায় প্রায় ১০০টি শকুন ছিল। ২০২৪ সালে বেশ কিছু শকুন মৌলভীবাজারে চলে যায়। সেখানে বিষক্রিয়ায় বেশ কয়েকটি শকুন মারা যায়। বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে শকুনের জন্য নিরাপদ খাদ্যের ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং এ কাজে আলাদা বাজেটও রাখা হয়েছে। এতে ধীরে ধীরে শকুনের সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করছেন তারা। রেমা-কালেঙ্গায় শকুনের দেখভালের দায়িত্বে থাকা গ্রাম পুলিশ সাজেন মুন্ডা জানান, শকুনের দেখাশোনায় ২৫ জন কাজ করছেন। সাজেন মুন্ডা বলেন, সরকারি উদ্যোগে বর্তমানে প্রতি মাসে দুটি গরু শকুনের খাবার হিসেবে দেওয়া হয়। গরুগুলো জবাই করে নির্ধারিত স্থানে শকুনের জন্য রেখে আসা হয়। সুন্দরবনেও একইভাবে নিরাপদ খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। আইইউসিএনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সালে দেশে শকুনের সংখ্যা বেড়ে ২৪৬টিতে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে অন্তত ৪০টি শকুন মৌলভীবাজারের একটি পাহাড়ি এলাকায় চলে যায়। সেখানে ১০টি স্ত্রী শকুনও ছিল। ওই এলাকায় বিষক্রিয়ায় শকুন মারা যাওয়ার ঘটনায় ছাগলের শরীরে কিটোপ্রোফেন ও ডাইক্লোফেনাক প্রয়োগের বিষয়টি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শকুন রক্ষায় আশার খবরও রয়েছে। ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে সরকারিভাবে শকুনের জন্য নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি শকুন সংরক্ষণ কার্যক্রমে বরাদ্দও দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে সময়ের সঙ্গে শকুনের সংখ্যা বাড়তে পারে। আইইউসিএনের প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট সুলতান আহমেদ বলেন, শকুন সাধারণত একটি সঙ্গী হারালে নতুন করে সঙ্গী গ্রহণ করে না। ফলে কোনো পুরুষ বা স্ত্রী শকুন মারা গেলে প্রজনন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। মৌলভীবাজারে বেশ কিছু শকুন মারা যাওয়ায় রেমা-কালেঙ্গার শকুনের প্রজননেও এর প্রভাব পড়েছে। তিনি আরও বলেন, শিয়াল নিধনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কীটনাশক বা বিষ ব্যবহার না করার জন্য স্থানীয়দের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, শকুন ‘প্রকৃতির ঝাড়ুদার’। মৃত প্রাণীর দেহাবশেষ খেয়ে এটি পরিবেশ পরিষ্কার রাখে এবং অ্যানথ্রাক্সসহ বিভিন্ন রোগের বিস্তার রোধে সহায়তা করে। তাই মানুষের নিজেদের প্রয়োজনেই শকুনকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। আইইউসিএনের প্রকল্প সহকারী শাকিব আহমেদ বলেন, শকুন জীবন বাঁচায়। তাই শকুনকে বাঁচাতে হবে। শকুন বাঁচলে প্রকৃতি সুস্থ থাকবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সচেতনতা বাড়ানো, পশুর চিকিৎসায় ক্ষতিকর ওষুধের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং বিষ প্রয়োগ বন্ধ করা না গেলে শকুনের অস্তিত্ব রক্ষা কঠিন হবে। আর শকুন হারিয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু একটি পাখির বিলুপ্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রকৃতির সামগ্রিক ভারসাম্য।