প্রেস বিজ্ঞপ্তি ॥ আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন অনেক নেপথ্য নায়ক রয়েছেন, যাঁরা নীরবে-নিভৃতে দেশের জন্য অকাতরে কষ্ট সহ্য করেছেন। তেমনই একজন প্রচার বিমুখ বীর কৃতি সন্তান হলেন নবীগঞ্জ উপজেলার ১২নং কালিয়ারভাঙ্গা ইউনিয়নের লহরজপুর চৌধুরী বাড়ীর মরহুম মোহাম্মদ আকল মিয়া চৌধুরী। ১৯৭১ সালে মাতৃভূমি কে শত্রুমুক্ত করতে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় স্থানীয় ঘাটের বাজারে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন এই দেশপ্রেমিক ব্যক্তিত্ব।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মোহাম্মদ আকল মিয়া চৌধুরী স্বাধীনতার পক্ষে অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান নেন। তৎকালীন সময়ে নবীগঞ্জের পানিউমদার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও জনসমাগম স্থল “ঘাটের বাজারে” তাঁকে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা নির্মমভাবে আটক করে। দেশ স্বাধীন করার পক্ষে অস্ত্র তুলে নেওয়ার অপরাধে এই প্রকাশ্য বাজারেই তাঁর ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু বুকের ভেতর স্বাধীনতার যে লাল-সবুজ স্বপ্ন তিনি ধারণ করেছিলেন, শত নির্যাতনেও তা থেকে তাঁকে এক চুলও বিচ্যুত করা যায়নি।
মরহুম মোহাম্মদ আকল মিয়া চৌধুরীর সুযোগ্য উত্তর সূরিরা আজও বাবার সেই রক্তঝরা দিনগুলোর কথা মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বাবার মুখ থেকে শোনা স্বাধীনতার সেই নির্মম অথচ গৌরবোজ্জ্বল গল্পের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাঁর ছোট ছেলে যুক্তরাজ্য প্রবাসী মাওঃ আলী হায়দার চৌধুরী অশ্রুসজল চোখে বলেন, “বাবার মুখে যখন ঘাটের বাজারে নির্যাতনের বর্বরতা এবং স্বাধীনতার সেই গৌরবময় গল্প শুনছিলাম, তখন বাবার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলাম কেঁদো না বাবা, আমরা তো আজ স্বাধীন দেশ পেয়েছি।”
বাবার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে মরহুম মোহাম্মদ আকল মিয়া চৌধুরীর ব্যবহৃত প্রিয় গায়ের চাদরটি আজও তাঁর সন্তানেরা সুদূর যুক্তরাজ্যে (টক) অত্যন্ত যত্ন ও পরম মমতায় সংরক্ষণ করে রেখেছেন। এই চাদরটি যেন প্রবাসের মাটিতেও বাবার স্পর্শ, স্নেহ এবং তাঁর দেশপ্রেমের এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে রয়ে গেছে।
১৯৩০ সালে মোহাম্মদ আকল মিয়া চৌধুরী ঐতিহ্যবাহী লহরজপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুন্সী আমরু মিয়া চৌধুরী ও মাতার নাম কলম চান্দ বিবি চৌধুরাণী।
ব্যক্তি জীবনে মোহাম্মদ আকল মিয়া চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত ও পরোপকারী একজন মানুষ। মুখে সদা “মৃদু হাসি” আর “মিষ্টি কথা” দিয়ে তিনি সমাজের ধনী-দরিদ্র সর্বস্তরের মানুষকে আপন করে নিতেন। সকলেই তাঁকে ভালো বাসতো ও শ্রদ্ধা করতো। ১৯৮১ সালে মাত্র ৫১ বছর বয়সে এই বীর ও কৃতি সন্তান ইন্তেকাল করেন।
দেশপ্রেমিক আকল মিয়া চৌধুরীর মৃত্যুর পর কালের নিয়মে অনেক কিছুই বদলে গেছে। তবুও সুদূর যুক্তরাজ্যে থেকেও আলী হায়দর চৌধুরী তাঁর নিজের গ্রাম লহরজপুরের স্মৃতি ও পূর্বপুরুষদের বীরত্বকে সবসময় বুকে ধরে রেখেছেন। জীবনের এই সময়ে এসে তিনি যেন তাঁর দেশপ্রেমিক পিতা মরহুম আকল মিয়া চৌধুরীর রেখে যাওয়া আদেশ, আদর্শ আর স্নেহের চাদরটি গায়ে মুড়ি দিয়ে স্মৃতির মাঝে ডুবে আছেন। চাদর জড়ানো এই শান্ত রূপটি আসলে তাঁর নিজের জন্মভূমি এবং বংশের শিকড়ের প্রতি এক গভীর ভালোবাসার প্রকাশ।
তাঁর এই কষ্ট ও ত্যাগ লহরজপুর (চৌধুরী বাড়ী) তথা পুরো নবীগঞ্জবাসীর জন্য এক চিরন্তন অহংকার।