স্টাফ রিপোর্টার ॥ হিন্দু ধর্মাবলম্ভীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। এই উৎসবকে কেন্দ্র হবিগঞ্জের প্রতিটি মন্ডপে প্রতিমাগুলো রং তুলি দিয়ে সাজানোসহ সাজ-সজ্জার কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। পূজা শুরু আগেই মন্ডপে প্রতিমা তৈরী শেষ বলে জানিয়েছেন মৃত শিল্পীরা। ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী দেবীর বোধন ও পূজার মধ্য দিয়ে এর মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ২১ অক্টোবর মহা দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এ উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে। প্রতি বছরের ন্যায় এবার সনাতনী পঞ্জিকা অনুযায়ী মহালয়া হবে ১০ অক্টোবর। ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী পূজার মাধ্যমে শুরু হবে দুর্গাপূজার মূল অনুষ্ঠান। ১৯ অক্টোবর মহাঅষ্টমী এবং ২০ অক্টোবর মহানবমী পূজা। ২১ অক্টোবর মহাদশমী বা বিজয়া দশমী হবে। এ দিন প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। এবার জেলার ৯টি উপজেলার ৬৬৪টি মন্ডপে এ উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে ছয়টি পৌরসভায় ৮৪টি মন্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলছে। ৯টি উপজেলার মধ্যে সদরে ৪৪, শায়েস্তাগঞ্জে ১২, লাখাইয়ে ৬৬, আজমিরীগঞ্জে ২৭, বানিয়াচংয়ে ১২২, চুনারুঘাটে ৭৩, মাধবপুরে ১০০, বাহুবলে ৫৫ ও নবীগঞ্জ উপজেলায় ৮১টি মন্ডপ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া পৌরসভাগুলোর মধ্যে রয়েছে হবিগঞ্জ পৌরসভায় ৩৫, শায়েস্তাগঞ্জ ৮, আজমিরীগঞ্জ ৮ ও চুনারুঘাট পৌরসভায় ৯, মাধবপুরে ১৫ ও নবীগঞ্জ পৌরসভায় ৯টি।
সরেজমিনে বিভিন্ন পূজামন্ডপে ঘুরে দেখা যায়-কাদা-মাটি, বাঁশ, কাঠ, খড় ও সুতলি খড় দিয়ে শৈল্পিক ছোঁয়ায় গড়ে তোলা দেবীদুর্গার প্রতিমা তৈরিতে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃত শিল্পীরা।
মৃৎ শিল্পী সদর উপজেলার রিচি গ্রামের কার্তিক পাল জানান, প্রতি বছর এ সময় ১৫/২০টি পূজা মন্ডপের প্রতিমা তৈরীর কাজ করে থাকি। এ বছর ১৪টি পূজা মন্ডপের কাজ করছি। প্রতিটি প্রতিমার তৈরীতে ৩৫/৪০ হাজার টাকা খরচ আসবে। আর যারা বড় ধরণের প্রতিমা তৈরী করেন তাদের ৭০/৮০ হাজার টাকা খরচ কারিগরদের দিতে হবে।
তিনি জানান, সব কিছু জিনিসের দাম বেশি হওয়ায় প্রতিমাগুলো তৈরীতে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার আমাদের খরচ বেশি হবে। এ তুলনায় আমরা যারা কারিগর রয়েছি, তাদের তেমন লাভ হবে না। তারপর আমাদের বাপ-দাদার আদি পেশা এটি। তা আমাদের ধরে রাখতে হবে।
তিনি বলেন-১২টি প্রতিমা কাজ শেষ করেছি। আরো ২টি প্রতিমা কাজ হাতে রয়েছে। তাও ২/৩ দিনের ভিতরে শেষ করবো। পূজা শুরু আগেরই আমাদের সকল প্রস্তুতি শেষ হবে। শহরের মাছুলিয়ার মাছুলিয়ার মৃত শিল্পী অজিত পাল জানান, ছোট বেলা থেকে এ পেশার সাথে জড়িত। এ প্রতি বছর পূজা সময়ে আমাদের কাজের চাহিদা একটু বেশি থাকে। এ বছর ৮টি প্রতিমা কাজ হাতে নিয়েছিলাম। এর মধ্যে ৬টির কাজ শেষ করেছি। বাকি ২টির কাজ খুব শ্রীঘই শেষ করবো। নিজের মনের মত কাজ করে প্রতিটি প্রতিমার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছি। রং তুলির মাধ্যমে সাজিয়ে তুলেছি। যা পূজারীদের আকর্শন ও পূজোয় মন খারবে। তবে তিনি বলেন-প্রতিমা তৈরীতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হয়। যে কারণে আমরা কাজ করে তেমন লাভবান হচ্ছি না। তারপর আমাদের ধর্মীয় উৎসব বা সংস্কৃতি পালনের জন্য আমাদের প্রতিমা তৈরীর কাজ করতে হয়। মাছুলিয়া এলাকার বাসিন্দা মৃত শিল্পী অ্যাডভোকেট রঞ্জিত পাল জানান, মৃত শিল্পটা আমার বাপ-দাদার আদি পেশা। ছোট বেলায় লেখাপড়ার পাশাপাশি প্রতিমা তৈরীর কাজ শেখা হয়। এখন আইন পেশার পাশাপাশি শখের বসে এ পেশাটি ধরে রাখছি। প্রতি বছর পূজার সময়ে এক থেকে দেড় মাস এ কাজ করি। এবার ৭টি প্রতিমার কাজ করছি। এর মধ্যে ৫টির কাজ শেষ আর ২টি কাজ রয়েছে। সেগুলো পূজার আগেই শেষ করবো। তিনি বলেন-প্রতিমাগুলো নিজের মনে মত তৈরী করেছি। আশাকরি পূজা উদযাপন কমিটি সেগুলোকে পচন্দ করবেন। তিনি বলেন-প্রতিমা তৈরীর সময়ে কোন ধরণের বাঁধা বিপত্তি আসেনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের সহযোগিতা করা হয়েছে। বাকি দিনগুলোতে প্রশাসন আমাদেরকে সহযোগিতা করবে। সাজসজ্জার কারিগড় হেলাল মিয়া জানান, আমি ঢাকা থেকে হবিগঞ্জের নায়ের এর পুকুর পাড়ের পূজা মন্ডপের সাজসজ্জার কাজ করতে এসেছি। এ মন্দিরটি ভারতের একটি মন্দিরের ডিজাইনের আদলে তৈরী করা হচ্ছে। দূর্গাপূজা শুরুতে তা প্রস্তত করা হবে।
হবিগঞ্জ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক লায়ন অ্যাডভোকেট অর্জুন চন্দ্র রায় জানান, হবিগঞ্জ একটি সম্প্রীতির জেলা। অতীতে যেমন এ জেলায় শান্তিপূর্ণ ভাবে পূজা উদযাপন হয়েছে আশাকরি এবারও শান্তিপূর্ণ ভাবে পূজা উদযাপন করা হবে। তিনি বলেন-এবার ৬৬৪টি মন্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। মন্ডপগুলোতে এখন প্রতিমা তৈরী ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। পূজার আগেই সাজসজ্জার কাজ শেষ হবে। প্রতিমা তৈরীসহ সাজসজ্জার কাজ করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত কোন ধরণে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আশাকরি বাকি সময়ে কোন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে না। তবে বিদ্যুৎতের লোডশেডিং ও নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তিনি। এছাড়াও তিনি বলেন-শহরের সকল পূজা মন্ডপই সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। গ্রামঞ্চলের অনেক পূজা মন্ডপও সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে।
এ ব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) রাশেদুল হক চৌধুরী জানান, মন্দিরগুলোতে প্রতিমা তৈরীতে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। শান্তিপূর্ণ ভাবে মৃত শিল্পীরা প্রতিমা তৈরী ও সাজসজ্জার কাজ করছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পূজা উদযাপন কমিটি নেতৃবৃন্দের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। আশাকরি শান্তিপূর্ণ ভাবে হিন্দু ধর্মাবলম্ভীরা পূজা উদযাপন করতে পারবেন।