হাবিবুর রহমান নোমান, বাহুবল প্রতিনিধি ॥ মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বাহুবলের ফয়জাবাদ বধ্যভূমি দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বধ্যভূমির বিভিন্ন স্থাপনা ও স্মৃতিচিহ্ন ভাঙাচোরা হয়ে পড়েছে। টিলা ঘেঁষা এই ঐতিহাসিক স্থানটি অনেকটাই অরক্ষিত অবস্থায় থাকায় সন্ধ্যার পর সেখানে নেমে আসে নীরবতা ও অন্ধকার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধারে সেখানে নিয়মিত মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। এতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত গুরুত্বপূর্ণ স্থানটির পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাহুবল উপজেলার শেষ প্রান্তে ঢাকা-সিলেট ভায়া মৌলভীবাজার আঞ্চলিক সড়কের পাশে আমতলী চা-বাগানের ৪ নম্বর সেকশনের একটি টিলার ওপর ফয়জাবাদ বধ্যভূমির অবস্থান। মিরপুর বাজার থেকে কিছুটা এগিয়ে জ্বালানি তেল শোধনাগারের প্রধান ফটকের বিপরীত পাশ দিয়ে টিলায় ওঠার সিঁড়ি রয়েছে। চারপাশ টিলা, গাছপালা ও ঝোপ-ঝাড়ে ঘেরা। দীর্ঘদিন নিয়মিত পরিচর্যা না হওয়ায় বধ্যভূমির বিভিন্ন স্থানে আগাছা ও ঝোপ-ঝাড় দেখা গেছে।
টিলায় উঠার সিঁড়ির বিভিন্ন অংশ নড়বড়ে হয়ে গেছে। কোথাও নেই রেলিং, বধ্যভূমির মূল স্থাপনার বিভিন্ন অংশ ও টাইলসও ভেঙে গেছে। কোথাও কোথাও স্থাপনার সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্মৃতিচিহ্নের বিভিন্ন অংশ। সন্ধ্যার পর পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা না থাকায় পুরো এলাকাটি অন্ধকার ও নির্জন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের বেলায় নিরাপত্তা ও নজরদারির কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বধ্যভূমিটি মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। প্রতিরাতে সেখানে বিভিন্ন বয়সী লোকজনের আনাগোনা দেখা যায়। এতে একদিকে যেমন মাদকসেবনের অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটির পবিত্রতা ও নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কাউছার মিয়া বলেন, প্রতিরাতেই বধ্যভূমিতে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। তারা অনেকটা নির্ভয়ে সেখানে মাদক সেবন করেন। গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানটিতে নিয়মিত পাহারা ও নজরদারি থাকা দরকার। পাশাপাশি দ্রুত সংস্কার করে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাহুবল উপজেলা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য বাঙালি নারী-পুরুষকে এই এলাকায় এনে হত্যা করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সেই নির্মম হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি ধরে রাখতে পরবর্তীতে ফয়জাবাদ বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে ২০০৬ সালে টিলায় ওঠার জন্য সিঁড়ি নির্মাণ এবং হত্যাকাণ্ডের স্থানটিতে স্মৃতিচিহ্ন নির্মাণ করা হয়। ২০০৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান বধ্যভূমিটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন।
নির্মাণের পর বিভিন্ন জাতীয় দিবসে এখানে শ্রদ্ধা নিবেদনসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়ে আসছে। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে প্রদীপ প্রজ্বালনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করা হয়। পাশাপাশি ইতিহাস জানতে বিভিন্ন সময় দর্শনার্থীরাও এখানে আসেন। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও সংস্কারের অভাবে দিন দিন বধ্যভূমিটির অবস্থা নাজুক হয়ে পড়ছে।
জানা গেছে, পরবর্তীতে ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলা পরিষদ, হবিগঞ্জের অর্থায়নে বধ্যভূমিটির সংস্কারের জন্য ৩ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। কিন্তু সংস্কারের পর এক বছর না যেতেই পুনরায় স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত ও নষ্ট হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ে সংস্কার করা হলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার অভাবে এর সুফল স্থায়ী হচ্ছে না।
মাঝেমধ্যে আমতলী চা-বাগান কর্তৃপক্ষ বধ্যভূমির আশপাশের ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার করলেও স্থায়ীভাবে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়মিত কোনো জনবল নেই। ফলে কয়েক মাস পরপরই আগাছা ও ঝোপ-ঝাড়ে স্থানটি ঢেকে যায়। এ ছাড়া রাতে কোনো নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজ্জ্বল রায় বলেন, বধ্যভূমিটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ কিংবা নিয়মিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাঠামো নেই। রাতে সেখানে মাদকসেবীদের উপস্থিতির কারণে স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, রেলিংগুলো নেই, টাইলস ভেঙে নেওয়া হয়েছে। আগে মেরামতের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু মেরামত করার পরও আবার মাদকসেবীসহ অন্যরা সেগুলো নষ্ট করে কিংবা খুলে নিয়ে যায়। এ ধরনের বধ্যভূমিতে নিয়মিত পাহারার জন্য নাইট গার্ডের ব্যবস্থাও নেই।
ইউএনও আরও বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে জানানো যেতে পারে। বধ্যভূমিটি কীভাবে সংরক্ষণ করা যায় এবং নিরাপদ রাখা যায়, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী ফয়জাবাদ বধ্যভূমিকে শুধু জাতীয় দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। দ্রুত বধ্যভূমিটির ভাঙাচোরা অংশ সংস্কার, সিঁড়ি ও রেলিং মেরামত, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সীমানা সুরক্ষা এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাতে নিরাপত্তাকর্মী বা পাহারার ব্যবস্থা করা হলে স্থানটির পরিবেশ ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে বধ্যভূমিটিতে তথ্যসমৃদ্ধ ফলক ও প্রয়োজনীয় সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলারও দাবি জানিয়েছেন তারা।