এসএম সুরুজ আলী ॥
হবিগঞ্জের ৭টি বেইলি সেতু পরিবহন চলাচলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জীবনের ঝুকি নিয়ে এসব সেতু দিয়ে চলাচল করছে হালকা ও ভারী যানবাহন। এতে সেতুগুলোতে ঘটছে দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনায় মারা গেছেন এক বৃদ্ধা। হবিগঞ্জ জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ চৌধুরী বাজার এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া খোয়াই নদীর উপর ১৯৮৬ সালে নির্মাণ করা হয় ৮২ মিটার দৈর্ঘ্যের উমদা মিয়া বেইলি সেতু। নির্মানের পর থেকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার কিছু অংশ, বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, নবীগঞ্জ উপজেলার মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম দাঁড়িয়েছে সেতুটি। স্টিলের ওই সেতুটির চাপ কমাতে দুই পাশে আরো ২টি নতুন সেতু নির্মাণ করা হয়। তবে শহরের মাঝ বরাবর হওয়ায় এখনো ওই সেতুটি দিয়ে বেশি চলাচল করেন স্থানীয়রা। কয়েক বছর ধরে সেতুটি দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে যানবাহনসহ লোকজন চলাচল করছেন। বর্তমানে সেতুটি অবস্থা একেবারেই নরবড়ে হয়ে গেছে। সেতুর মধ্যে লাগানো অনেক স্ল্যাব উঠে গেছে অনেক স্থানে আবার স্ল্যাব ভেঙ্গে গেছে। পাশাপাশি সেতুর নিচে পিলার ভেঙ্গে গেছে। কোন রকম জোরাতালি দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। সেতুর পাশে সাইন বোর্ড টানিয়ে রাখা হয়েছে। ৫ টনের অধিক ভারি যান চলাচল নিধেষ করা হলেও। সেতুটি দিয়ে প্রতিনিয়ত ঝুকিপূর্ণ চলাচল করছে শত শত যানবাহন। সম্প্রতি ঝুকিপূর্ণ ওই সেতুটির ভাঙ্গা স্থান দিয়ে ছিটকে পড়ে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। শুধু উমদা মিয়া বেইলি সেতু নয়, একই অবস্থায় জেলার হবিগঞ্জ-বানিয়াচং সড়কের রত্না বেইলি সেতু, একই সড়কের শুটকি বেইলি সেতু, হবিগঞ্জ-নবীগঞ্জ সড়কের বালিখাল সেতু ও চুনারুঘাটে খোয়াই নদীর উপর নির্মিত কাজিরখিলসহ ৭টি সেতু। স্টিলের ওই বেইলী সেতুগুলো ভেঙ্গে দ্রুত ৪ লেনের পাকা সেতু নির্মাণের দাবি স্থানীয়দের।
সরেজমিনে সেতুগুলো ঘুরে দেখা যায়, সেতুগুলো চরম ঝুকিপূর্ণ হয়ে দাড়িয়ে আছে। সেতুর স্থায়ী পিলারগুলো দূর্বল হয়ে পরায় লাগানো হয়েছে আলাদা লোহার অস্থায়ী পিলার। বৃষ্টির দিনে সেতুগুলোর অবস্থা যেন আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে। কোন কোন স্থানে সেতুর উপর রেলিং পর্যন্ত ভেঙে গেছে। যার ফলে ভারী যানবাহন সেতুর উপরে উঠলে কাপতে শুরু করে। যদিও মাঝে মধ্যে সেতুতে উঠে যাওয়া স্ল্যাব গুলো সংস্কার করে দিচ্ছে সওজ কর্তৃপক্ষ। তবে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবারো সেতুগুলো পুরনো রূপে ফিরে আসে। তবুও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় চরম ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে যাত্রী ও পণ্যবাহি পরিবহণসহ সাধারণ মানুষকে।
এ ব্যাপারে উমেদনগর পশ্চিম এলাকার বাসিন্দা মামুন মিয়া জানান, চৌধুরী বাজার নতুন খোয়াই মুখ এলাকার পুরাতন উমদা মিয়া বেইলী সেতুটি এখন মরণ ফাদে পরিনত হয়েছে। যে কোন সময় সেতু ভেঙ্গে পড়ে যেতে পারে। ইতিপূর্বে সেতুটি থেকে পড়ে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। বড় ধরণের দুর্ঘটনা এড়াতে দ্রুত সেতুটি ভেঙ্গে নতুন করে এখানে আরসিসি বা গার্ডার সেতু নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
সিএনজি অটোরিক্সা চালক এরশাদ আলী জানান, আমি প্রতিদিন হবিগঞ্জ বানিয়াচং সড়কে সিএনজি চালাই। ওই সড়কের সুটকী ও রত্না বেইলী সেতুটি ঝুকিপূর্ণ। এ ২টি সেতু দিয়ে একত্রে কয়েকটি যানবাহন উঠলেই সেতু কাঁপতে শুরু করে। এসময় মনে মনে ভয় হলেও কোন রকম পার হয়ে যাই। তবে যাত্রীরা সবসময় আতঙ্কে থাকেন।
সুমন মিয়া নামে এক চালক জানান, রত্না সেতুর কিছু কিছু অংশে স্ল্যাব উঠে গেছে। যার কারণে অনেক সময় সেতুতে গাড়ির চাকা আটকে যায়। ফলে বেড়ে যায় দুর্ঘটনার শঙ্কা। ইতিপূর্বে ওই সেতুটি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
ট্রাক চালক মহিবুর রহমান জানান, ট্রাক দিয়ে আমরা মালামাল আনা নেয়া করি। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই ঝুকিপুর্ণ হওয়া সত্বেও সেতুগুলো দিয়ে ট্রাক চালাই। তিনি বলেন, এখনই যদি সেতুগুলো সংস্কার কিংবা নতুন সেতু নির্মাণ করা না হয় তা হলে বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে সড়ক বিভাগ জানিয়েছে সেতুগুলো সংস্কারের কয়েক বছরে কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। নতুন করে আধুনিক সেতু নির্মানের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পার্থ সরকার জানান, বেইলি সেতুগুলো নতুন করে করার জন্য ডিজাইন তৈরী করা হচ্ছে। ডিজাইন তৈরীর বেইলি সেতুগুলো অপসারণ করে আরসিসি বা গার্ডার সেতু নির্মাণের জন্য আম্বেলা প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ঝুকিপূণ বেইলি সেতুগুলো ৫ টনের বেশি ওজন বহন করতে সক্ষম নয়। যে কারণে প্রতিটি সেতুর প্রবেশ মূখে ৫ টনের অধিক পরিবহণ প্রবশে কাড়া নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সাইনবোর্ড টানিয়ে রাখা হয়েছে। জনদুর্ভোগ লাগবে দ্রুত বেইলী সেতুগুলো ভেঙ্গে পাকা তৈরী নির্মাণ করার প্রত্যাশা হবিগঞ্জ জেলাবাসী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হবিগঞ্জ শহরের উত্তর দিকে পূর্ব-পশ্চিমে বয়ে চলা খোয়াই নদীর উপর ১৯৮৪ সালে নির্মাণ করা হয় উমদা মিয়া বেইলি সেতু। এই সেতু দিয়েই বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, নবীগঞ্জ ও সিলেটগামী যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহণ চলাচল করত। এক সময় সেতুটি দূর্বল হয়ে পরলে ২০০৫ সালে বিকল্প হিসেবে ভারি যানবাহন চলাচলের জন্য উমদা মিয়া সেতুর পূর্ব দিকে কিবরিয়া বেইলি ব্রীজ বা সেতু নির্মাণ করা হয়। নির্মাণের কয়েক বছর পরপরই সেই সেতুটিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পরে। বর্তমানে সেতু দুটির অবস্থা একেবারেই নরবড়ে ও ঝুকিপূর্ণ। সেতুর মধ্যে লাগানো অনেক স্ল্যাব উঠে গেছে অনেক স্থানে আবার স্ল্যাব ভেঙ্গে গেছে।
পাশাপাশি সেতুর নিচে পিলার ভেঙ্গে গেছে। কোন রকম জোরাতালি দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। সেতুর পাশে সাইন বোর্ড টানিয়ে রাখা হয়েছে। যাতে লেখা রয়েছে ৫ টনের অধিক ভারি যান চলাচল নিধেষ। ঝুকিপূর্ণ হওয়া সত্বেও সেতু দুটিতে প্রতিনিয়ত চলাচল করছে শত শত যানবাহন। শুধু উমদা মিয়া বেইলি সেতু ও কিবরিয়া বেইলি সেতুই নয়, একই অবস্থা জেলার আরো ৫টি সেতুর। সেগুলো হল, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শায়েস্তাগঞ্জে খোয়াই নদীর উপর নির্মিত বেইলি সেতু, হবিগঞ্জ-বানিয়াচং সড়কের রত্না বেইলি সেতু, একই সড়কের শুটকি বেইলি সেতু, হবিগঞ্জ-নবীগঞ্জ সড়কের বালিখাল সেতু ও চুনার”ঘাটে খোয়াই নদীর উপর নির্মিত কাজিরখিল সেতু।