স্টাফ রিপোর্টার ॥ হবিগঞ্জের তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘উদ্যোগ (ইউ.ডি.ওয়াই.ও.জি)’ কর্মসূচির আওতায় হবিগঞ্জ জেলার ৯ উপজেলার সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে বের করে ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণ বা উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন করা হবে। এ কর্মসূচিতে একজন নির্বাচিত উদ্যোক্তার প্রকৃত ব্যবসায়িক চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ এবং ঋণের সমপরিমাণ টাকা অনুদান দেয়া হবে। পাইলট প্রোগ্রাম হিসেবে প্রথম পর্যায়ে হবিগঞ্জ জেলার ৯ টি উপজেলার ৯টি তফসিলি ব্যাংকে মনোনীত করা হয়েছে। তবে জেলা সদর ও উপজেলা পর্যায়ের যে কোন তফসিলী ব্যাংক থেকে আবেদন ফরম সংগ্রহ ও জমা দিতে পারবেন। ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে আবেদন শুরু হয়েছে। ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত আবেদনের শেষ তারিখ। পূবালী ব্যাংক পিএলসি হবিগঞ্জ প্রধান শাখা জেলার সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছে।
গতকাল বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পূবালী ব্যাংক পিএলসি হবিগঞ্জ প্রধান শাখায় সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পূবালী ব্যাংক পিএলসি হবিগঞ্জ শাখার হেড অব ব্রাঞ্চ ও এজিএম মোহাম্মদ ফসিহ উদ্দিন মাহতাব। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি নবীগঞ্জ শাখা প্রধান ও ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুশফিক উস সালেহীন এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংক হবিগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ দুলাল মিয়া।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে বের করে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক ‘উদ্যোগ (ইউ.ডি.ওয়াই.ও.জি) উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’ চালু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট ১৩ সেপ্টেম্বর এ কর্মসূচির নীতিমালা জারি করে।
এ কর্মসূচির বিশেষ দিক হলো-তরুণদের শুধু ব্যাংকে এসে আবেদন করার অপেক্ষায় থাকবে না ব্যাংকগুলো। বরং ব্যাংকের কর্মকর্তারা স্থানীয় পর্যায়ে গিয়ে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালাতেও ব্যাংক শাখাগুলোকে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা অনুসন্ধান ও আবেদন গ্রহণে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কথা বলা হয়েছে।
হবিগঞ্জ কেন গুরুত্বপূর্ণ :-
সংবাদ সম্মেলনে পূবালী ব্যাংকের হবিগঞ্জ শাখার প্রধান মোহাম্মদ ফসিহ উদ্দিন মাহতাব বলেন, বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে হবিগঞ্জ একটি সম্ভাবনাময় জেলা। এখানে রয়েছে চা-বাগান, হাওর, পাহাড় ও বন। এসব সম্পদকে কাজে লাগিয়ে তরুণদের জন্য নানা ধরনের ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, তরুণদের উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা গেলে তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করতে পারবেন। একই সঙ্গে তরুণদের মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রেখে ইতিবাচক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফসিহ উদ্দিন মাহতাবের ভাষায়, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার এ উদ্যোগ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
কারা আবেদন করতে পারবেন ;-
আবেদনের শেষ তারিখে বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর হলে বাংলাদেশের যে কোন নাগরিক এ কর্মসূচিতে আবেদন করতে পারবেন। তবে আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। নিজের ব্যবসা থাকতে পারে, ব্যবসার ধারণা থাকতে পারে অথবা নতুন ব্যবসা করার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকলেও আবেদন করা যাবে।
কৃষি ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, হস্তশিল্প, পর্যটন, সেবামূলক উদ্যোগ, সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হালকা প্রকৌশল এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপসহ বিভিন্ন বৈধ ব্যবসা এ কর্মসূচির আওতায় বিবেচিত হতে পারে।
তবে আগে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসায়িক ঋণ নেওয়া ব্যক্তি, ঋণখেলাপি এবং সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তি এ কর্মসূচির আওতায় অর্থায়নের জন্য যোগ্য হবেন না।
২০ লাখ টাকা মানেই সবাই ২০ লাখ পাবেন না-
নির্বাচিত উদ্যোক্তার প্রকৃত ব্যবসায়িক প্রয়োজন ও ব্যয়ের পরিকল্পনা যাচাই করে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়ন করা যাবে। ঋণ ও অনুদানের অনুপাত হবে ৫০:৫০। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ (ঋনের সমপরিমাণ) টাকা অনুদান হতে পারে। তবে প্রত্যেক উদ্যোক্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ২০ লাখ টাকা পাবেন না। ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজন ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, উদ্যোক্তার নিজস্ব বিনিয়োগ বা অন্য কোনো বৈধ অর্থের উৎস থাকলে সেটিও অর্থায়ন পরিকল্পনায় বিবেচনা করা হবে।
শুধু টাকা নয়, মিলবে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শও :-
‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির সুবিধা শুধু অর্থায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আবেদনকারীদের আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা ও উন্নয়নে প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞ উদ্যোক্তার পরামর্শ, ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএনসহ ব্যবসায়িক নিবন্ধন এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরির সুযোগও দেওয়া হবে।
হবিগঞ্জের ৯ উপজেলায় ৯ লিড ব্যাংক :-
হবিগঞ্জে কর্মসূচিটি সমন্বয়ের দায়িত্ব পেয়েছে পূবালী ব্যাংক পিএলসি, হবিগঞ্জ প্রধান শাখা। জেলার নয়টি উপজেলার জন্য নয়টি ব্যাংককে উপজেলা লিড ব্যাংক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আজমিরীগঞ্জে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, বাহুবলে উত্তরা ব্যাংক পিএলসি, বানিয়াচংয়ে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি, চুনারুঘাটে জনতা ব্যাংক পিএলসি, হবিগঞ্জ সদরে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসি, লাখাইয়ে সোনালী ব্যাংক পিএলসি, মাধবপুরে প্রাইম ব্যাংক পিএলসি, নবীগঞ্জে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি এবং শায়েস্তাগঞ্জে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি উপজেলা লিড ব্যাংক হিসেবে কাজ করবে।
এসব ব্যাংক নিজ নিজ উপজেলার সকল তফসিলি ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে তরুণ উদ্যোক্তা খোঁজা, প্রচার, আবেদন গ্রহণ ও পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করবে। জেলা সদর বা উপজেলার যে কোন তফসিলি ব্যাংক থেকে আবেদন ফরম সংগ্রহ ও জমা দেয়া যাবে।
আবেদনের সময় আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ :-
‘উদ্যোগ’ কর্মসূচিতে আবেদন শুরু হয়েছে ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে। আবেদন করা যাবে আগামী ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের পর কোনো আবেদন গ্রহণ করা হবে না।
আগ্রহী তরুণরা নিজ নিজ উপজেলার যে কোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখা থেকে আবেদন ফরম সংগ্রহ করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট ও এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্টের পোর্টাল থেকেও ফরম ডাউনলোড করা যাবে। আবেদনকারীকে পূরণ করা ফরমের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ (যদি থাকে) ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি দিতে হবে।
আবেদনকারী যে ব্যাংকে আবেদন করবেন, সেখানে আগে থেকে ব্যাংক হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক নয়।
আবেদন করলেই টাকা নয় :-
সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করা হয়, আবেদন করলেই অর্থায়ন নিশ্চিত হবে না। আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর ব্যবসার ধারণার যৌক্তিকতা, বাস্তবায়ন যোগ্যতা, বাজারের সম্ভাবনা, আর্থিক পরিকল্পনা, উদ্যোক্তার সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা বিবেচনা করে উদ্যোক্তা নির্বাচন করা হবে।
এ কর্মসূচিতে কোনো ধরনের তদবির করলে আবেদনকারী অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। মিথ্যা তথ্য দেওয়া কিংবা অন্যের ব্যবসায়িক ধারণা নিজের নামে ব্যবহার করার প্রমাণ পাওয়া গেলে আবেদন বাতিলের পাশাপাশি আবেদনকারীকে কালো তালিকাভুক্ত করা হতে পারে।
তরুণদের প্রতি আহ্বান :-
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, হবিগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকার সম্ভাবনাময় তরুণদেরও এ কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু শহরে নয়, উপজেলা ও গ্রামের পর্যায় থেকেও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা খুঁজে বের করবে ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার মূল লক্ষ্যও হলো স্থানীয় পর্যায়ে তরুণদের ব্যবসায়িক ধারণা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে অর্থায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়া।
তাই যেসব তরুণের বয়স ২৮ বছরের মধ্যে, নিজের ব্যবসার স্বপ্ন বা বাস্তবসম্মত কোনো ব্যবসায়িক ধারণা রয়েছে-তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
‘উদ্যোগে তরুণ গড়বে সমৃদ্ধ হবিগঞ্জ’-এই লক্ষ্যেই জেলার নয় উপজেলার ব্যাংকগুলো এখন সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করতে মাঠে নামছে।