স্টাফ রিপোর্টার ॥ নবীগঞ্জ উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত দিনারপুরে প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব। প্রশাসনের সেই অনুমতির আড়ালে বড় এক্সেভেটর দিয়ে রাতভর পাহাড় কেটে ট্রাকযোগে লাল মাটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে স্থানীয় একটি প্রকল্পের নির্মাণ কাজে। অন্যদিকে পাহাড় কাটার ফলে উঁচুতে থাকা আশপাশের বাড়িঘর ধ্বসে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ ঘটনায় প্রশাসনের অনুমতি প্রদানের যৌক্তিকতা ও অনুমতির শর্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি হলেও পাহাড় কেটে প্রতিবেশের ক্ষতি করার সুযোগ আইনে নেই।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নবীগঞ্জ উপজেলার দেবপাড়া ইউনিয়নের আইনগাঁও এলাকায় বসতবাড়ি নির্মাণের কথা উল্লেখ করে রুনু বেগম নামে এক নারীর নামে ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি থেকে মাটি কাটার জন্য আবেদন করা হয়। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ সেপ্টেম্বর নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা জেরিন স্বাক্ষরিত একটি পত্রে বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি থেকে সীমিত পরিসরে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়।
অনুমতিপত্রে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর সংশ্লিষ্ট বিধানের আওতায় মাটি উত্তোলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আইনটির ৭ (ক) ধারায় ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থেকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বসতবাড়ি নির্মাণের প্রয়োজনের তুলনায় বানিজ্যিক ভাবে অনেক বেশি পরিমাণ মাটি কাটা হচ্ছে।
বড় আকারের এক্সেভেটর দিয়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ফুট উচ্চতার একটি পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এতে পাহাড়ের প্রাকৃতিক আকৃতি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাত থেকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র এক্সেভেটর (ভেকু) মেশিন দিয়ে পাহাড় কাটার কাজ শুরু করে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পরে শুক্রবার ও শনিবার রাতভর এক্সেভেটর দিয়ে পাহাড়ের লাল মাটি কেটে ট্রাকযোগে সরিয়ে নেওয়া হয়।
পরে এসব মাটি আইনগাঁও এলাকায় নির্মাণাধীন বিবিয়ানা ২৩০/১৩২/৩৩ কেভি জিআইএস উপকেন্দ্রের ভরাট কাজে বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এদিকে, দিনারপুরের পাহাড়ি এলাকায় নির্বিচারে মাটি কাটার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ জেলা শাখার সহসভাপতি তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা হলেও পাহাড় কেটে পরিবেশ ও প্রতিবেশ ধ্বংস করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সীমিত আকারে পাহাড়-টিলা কাটার যে অনুমতি দিয়েছে, সেই ক্ষেত্রে পাহাড়-টিলা যারা কাটে, তাদের জন্য একটি বৈধতা তৈরি হলো। এতে আরও বেশি সুযোগ তৈরি হলো পাহাড় ও টিলা কেটে সমান্তরাল করার। তোফাজ্জল সোহেল বলেন, পাহাড় ও টিলা আমাদের প্রতিবেশ ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত ২০ বছর ধরে নবীগঞ্জ এলাকায় এক শ্রেণির অসাধু লোকজন পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান যে পাহাড় কাটার অনুমতি দিয়েছে এবং পাহাড় কাটার যে বৈধতা দেওয়া হয়েছে, সেটি খুবই নিন্দনীয়। তিনি বলেন, আইনগাঁও এলাকায় পাহাড় কেটে মাটি বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় প্রশাসনের অনুমতি পরিবেশ ধ্বংসের বৈধতা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
এ বিষয়ে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা জেরিন বলেন, ‘এক মহিলা বাড়ি তৈরির জন্য কিছু মাটি কাটার আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের পক্ষ থেকে সীমিত মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এখন জানতে পেরেছি, অনুমতির নামে তারা পাহাড় কাটছে। এ ঘটনা জানার পর মাটি কাটা বন্ধ রাখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’