স্টাফ রিপোর্টার ॥ এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে হবিগঞ্জ জেলায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। ২০২৬ সালের পরীক্ষায় জেলার পাসের হার ৪৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চার জেলার মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও বোর্ডের গড় ফলাফলের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে জেলা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, জেলার ৫৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৩টিতেই পাসের হার ৪০ শতাংশের নিচে। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ১০৪ জন শিক্ষার্থী। শিক্ষার মান, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলের বৈষম্য এবং শিক্ষার্থীদের সাফল্যের ব্যবধান সব মিলিয়ে জেলার সামগ্রিক ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বোর্ডের গড়ের চেয়ে পিছিয়ে: ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় হবিগঞ্জ জেলা থেকে ১২ হাজার ৬৯৯ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ৬ হাজার ৮৯ জন। সে হিসাবে পাসের হার ৪৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের গড় পাসের হার ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ, বোর্ডের গড়ের তুলনায় হবিগঞ্জের পাসের হার ২ দশমিক ৯৫ শতাংশ পয়েন্ট কম।
জেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ১০৪ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর শূন্য দশমিক ৮২ শতাংশ। বোর্ডের গড় জিপিএ-৫ পাওয়ার হার ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। সিলেট জেলায় এ হার ২ দশমিক ৯২ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান বলছে, শুধু পাসের হার নয়, সর্বোচ্চ ফল অর্জনের ক্ষেত্রেও এবার পিছিয়ে রয়েছে হবিগঞ্জ।
৩৩ প্রতিষ্ঠানের ফল নিয়ে প্রশ্ন: জেলার ৫৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৩টিতে পাসের হার ৪০ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ফলাফল কেন দুর্বল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কোন কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়ে রয়েছে, শিক্ষক সংকট বা পাঠদানের ঘাটতি রয়েছে কি না, কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কোনো দুর্বলতা ছিল কি না এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো কারণকে দায়ী করা যাচ্ছে না।
এক কলেজেই জেলার মোট পাসের ১৮ শতাংশ: জেলার সামগ্রিক ফলাফলে বড় অবদান রেখেছে জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজ। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১ হাজার ১১৫ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে। জেলার মোট পাস করা শিক্ষার্থীর প্রায় ১৮ দশমিক ৩ শতাংশই এই কলেজের। কলেজটির পাসের হার ৮২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অন্যদিকে, হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় পাসের হার ৬৪ দশমিক ৭১ শতাংশ। তবে বৃন্দাবন সরকারি কলেজের ফলাফল বাদ দিয়ে হিসাব করলে জেলার বাকি পরীক্ষার্থীদের পাসের হার নেমে দাঁড়ায় ৪৩ দশমিক ৮২ শতাংশে। এ হিসাব জেলার সামগ্রিক ফলাফলে প্রতিষ্ঠানভেদে সাফল্যের বড় ব্যবধান তুলে ধরে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভালো ফল করলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের সাফল্য নিশ্চিত করা যায়নি।
চার উপজেলায় পাসের হার ৪০ শতাংশের নিচে: উপজেলা ভিত্তিক ফলাফলে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে বাহুবল, লাখাই, মাধবপুর ও আজমিরীগঞ্জ।
বাহুবলে পাসের হার ৩৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ, লাখাইয়ে ৩৬ দশমিক ১২ শতাংশ, মাধবপুরে ৩৭ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং আজমিরীগঞ্জে ৩৮ দশমিক ০১ শতাংশ। এসব উপজেলায় পরীক্ষার্থীদের অর্ধেকেরও বেশি উত্তীর্ণ হতে পারেনি। অন্যদিকে, হবিগঞ্জ সদরের তুলনামূলক ভালো ফল জেলার সামগ্রিক পাসের হারকে এগিয়ে রাখতে ভূমিকা রেখেছে। ফলে উপজেলা ও প্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষার্থীদের সাফল্যের ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ছাত্রদের ফলাফলে বড় ঘাটতি: এবারের ফলাফলে ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্ররা পিছিয়ে রয়েছে। ছাত্রীদের পাসের হার ৫১ দশমিক ৮৬ শতাংশ, আর ছাত্রদের ৪১ দশমিক ৯২ শতাংশ। দুই পক্ষের পাসের হারের ব্যবধান ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ পয়েন্ট, যা সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চার জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ।
মোট পাস করা শিক্ষার্থীর প্রায় ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশ ছাত্রী। অন্যদিকে, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪ হাজার ৯৯৫ জন ছাত্রের মধ্যে ২ হাজার ৯০১ জন অকৃতকার্য হয়েছে। অর্থাৎ, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ছাত্রদের প্রায় ৫৮ শতাংশই পাস করতে পারেনি।
ছাত্রদের ফলাফলে এ বড় ব্যবধান কেন তৈরি হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠগ্রহণ, বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি জোরদার করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া দরকার বলে মনে করছেন হবিগঞ্জের সচেতন মহল ?
ফলাফল উন্নয়নে প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ: হবিগঞ্জ জেলায় এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের সামগ্রিক পরিসংখ্যান বলছে, হবিগঞ্জের এইচএসসি ফলাফলে একটি বড় বৈপরীত্য রয়েছে। একদিকে বৃন্দাবন সরকারি কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানের পাসের হার ৮০ শতাংশের বেশি, অন্যদিকে জেলার ৩৩টি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ৪০ শতাংশের নিচে।
এ পরিস্থিতিতে দুর্বল ফল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল পৃথকভাবে বিশ্লেষণ, বিষয়ভিত্তিক সাফল্য ও ব্যর্থতা চিহ্নিত করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর সহায়তামূলক কর্মসূচি নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ছাত্রদের কম পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়ার নিম্ন হার নিয়েও প্রয়োজন বিস্তারিত পর্যালোচনা।
শুধু জেলার সামগ্রিক পাসের হার দিয়ে শিক্ষার মান বিচার না করে প্রতিষ্ঠান ও উপজেলাভিত্তিক বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ভালো ফলের আড়ালে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা আড়ালেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন অভিভাবকরা।
হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: মঈনুল হক কালবেলাকে বলেন, ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় হবিগঞ্জ জেলার ১২ হাজার ৬৯৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৬ হাজার ৮৯ জন। পাসের হার ৪৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। জেলায় মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ১০৪ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর শূন্য দশমিক ৮২ শতাংশ। বোর্ডের গড় জিপিএ-৫ পাওয়ার হার ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। তিনি জানান, এবারের ফলাফলে ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্ররা পিছিয়ে রয়েছে। ছাত্রীদের পাসের হার ৫১ দশমিক ৮৬ শতাংশ, আর ছাত্রদের ৪১ দশমিক ৯২ শতাংশ। তিনি বলেন, শুধু পাসের হার নয়, সর্বোচ্চ ফল অর্জনের ক্ষেত্রেও এবার পিছিয়ে রয়েছে হবিগঞ্জ জেলা।
বৃন্দাবন সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো: জামাল উদ্দিন কালবেলাকে বলেন, আমরা ফলাফল আরো ভালো চাই। বিশেষকরে অভিভাবকদের সাহায্যটা বেশি দরকার। অনেক শিক্ষার্থী বাসা থেকে বের হয়ে কলেজে আসেনা অথচ অভিভাবকরা জানেননা তাদের সন্তানরা যে নিয়মিত কলেজে আসেনা। পরীক্ষায় ফেল করলে অভিভাবক এসে বলেন তাদের সন্তানরা কলেজের কথা বলে বাসা থেকে আসে। আমাদের শিক্ষক সংকট রয়েছে, তারপরেও বৃন্দাবন সরকারী কলেজে ভালো ফলাফলের জন্য আমরা শিক্ষকরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু ২৪ এর গনঅভ্যুত্থানের পর এক ধরনের ছাত্রদের মধ্যে পড়াশোনা না করার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আর তার জন্য অভিভাবকদেরকেই আরো বেশি সচেতন হতে হবে।